বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান বলেছেন, সংসদে উপস্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম বাজেট হলেও এই বাজেটে জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাজেট উপস্থাপনের পর তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করে বাজেট প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মিছিল পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আযাদ বলেন “সরকার জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে দলীয়কর্মী পালনের বাজেট উপস্থাপন করেছে”। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অর্থমন্ত্রী যেই বাজেট উপস্থাপন করেছে সেই বাজেট গণবিরোধী ও লুটপাটের বাজেট। এই বাজেটে জুলাই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হয়নি। পুরোনো ব্যবস্থার বাজেটের চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। এই বাজেট বিশাল ঋণ নির্ভর বাজেট। এই বাজেটে ঋণ ও করের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সরকার গণবিরোধী বাজেট উপস্থাপন করেছে।

দলীয় কর্মীদের লুটপাটের জন্য বাজেটের আকার বৃদ্ধি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নয়ন বরাদ্দের তহবিল যাবে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের পকেটে। যারা বাজেট প্রণয়ন করেছে তারা ধনী শ্রেণীর বলে তারা ধনী বান্ধব বাজেট প্রণয়ন করেছে। তারা গরিবের দুঃখ-কষ্ট বুঝে না এজন্য তারা গরিব বান্ধব বাজেট প্রণয়ন করতে পারেনি। বাজেট প্রণয়নে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে জনবান্ধন বাজেট উপস্থাপন করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বাজেটের ৭০ শতাংশ চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয় হিসাবে! তাহলে জনগণ বাজেট দিয়ে কী উপকৃত হবে সেটি সরকার বিবেচনা করেনি। তিনি বলেন, সরকারের উপস্থাপিত বাজেট থেকে ১ লাখ কোটি টাকার কম বাজেট প্রস্তাব করেছে জামায়াতে ইসলামী। কারণ জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটে দলীয় কর্মীদের পালন করা হবে না, লুটপাটের সুযোগ থাকবে না,দুর্নীতি হবে না। জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেট সরাসরি জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হবে। তাই উপস্থাপিত বাজেট সংশোধন করে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেট অনুসরণ করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উপস্থাপিত বাজেটের মধ্য ৬ লাখ ৯৫হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে! যার মধ্যে এনবিআর-কে একাই তুলতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল রাজস্ব আদায়ের চাপ সামলাতে গিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আগাম কর (অফাধহপব ঞধী), কাস্টমস ডিউটি এবং বিভিন্ন সেবার ওপর পরোক্ষ কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়ের সীমা ৩.৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩.৭৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে, তবুও পরোক্ষ করের খড়গ সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দেবে। এই বিশাল রাজস্ব আদায়ের ফলে জনগণের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরো বেশি দারিদ্রতার মুখোমুখি হবে। তিনি বলেন, উপস্থাপিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। (যা জিপিডির প্রায় ৩.৬%)। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজারকোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার যদি ব্যাংক থেকে এতো বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করে, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে (ঈৎড়ফিরহম-ড়ঁঃবভভবপঃ)। ফলে নতুন ব্যবসা শুরু করা বা শিল্প প্রসারে উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয়ঋণ পাবেন না, যা সামগ্রিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা আনতে পারে। সরকারের উপস্থাপিত বাজেটে একদিকে করের বোঝায় জনগণ পিষ্ট হবে, অন্যদিকে ঋণের বোঝায় দেশ কাবু হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল বলেন, বাজেটের আকার বিশাল হলেও বাজেট জনবান্ধনবের পরিবর্তে দলীয় বান্ধব বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। উপস্থাপিত বাজেটে সরকার দলীয় ব্যবসায়ী, দলীয় সন্ত্রাসী আর চাঁদাবাজরা উপকৃত এবং সুবিধাভোগী হচ্ছে। সুতরাং এই সরকারকে জনবান্ধন সরকার বলা যায় না। এই সরকার পুরোপুরি দলীয় বান্ধব সরকার। জনবান্ধন বাজেট উপস্থাপন করতে না পারলে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেট অনুসরণ করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেনের পরিচালনায় বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইটে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ শামছুর রহমান প্রমুখ।

এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ও মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য আবদুস সালাম, মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ড. মোবারক হোসেন, শাহীন আহমেদ খান, মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন, সহকারী মিডিয়া সম্পাদক আশরাফুল আলম ইমনসহ মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ। সমাবেশ শেষে, বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেইট থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল পল্টন মোড় হয়ে বিজয়নগর প্রদক্ষিণ করে শেষ হয়। মিছিলে অংশগ্রহনকারী হাজার-হাজার বিভিন্ন শ্রেনীপেশার লোকজন সরকারের উপস্থাপিত বাজেট সংশোধন করে জনবান্ধব বাজেট ঘোষণা দাবি জানান।

মহানগর উত্তর জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল

এদিকে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের জন্য ঘোষিত বাজেটকে গণবিরোধী ও শোষণের হাতিয়ার উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লা। রাজধানীর উত্তর বাড্ডার ওভার ব্রিজের নিচে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত সরকার ঘোষিত বাজেট প্রত্যাখান করে এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষোভ পূর্ব সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ইয়াসিন আরাফাতের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক। উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার নো’মান আহমেদি, মজলিসে শূরা সদস্য মাওলানা কুতুবউদ্দিন ও ফজলে আহমেদ প্রমুখ। বিক্ষোভ মিছিল উত্তর বাড্ডা থেকে শুরু হয়ে গুলশান লিংক রোডে এসে শেষ হয়।

নাজিম উদ্দীন মোল্লা বলেন, সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের খাতের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। উপেক্ষিত হয়েছে রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোও। জনগণ আশা করেছিলো জুলাই বিপ্লবের পর নতুন সরকার একটি গণমুখি বাজেট প্রদান করবে। কিন্তু সরকার জনগণকে আশাহত করে গণবিরোধী বাজেট দিয়ে পতিতদের মত স্বৈরাচারি আচরণ শুরু করেছে। ঘোষিত বাজেটে গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। তিনি সরকারকে সময় থাকতে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে পরামর্শ করে বাজেট সংশোধনের আহ্বান জানান।

ডা. ফখরুদ্দিন মানিক বলেন, বাজেটের পরিসর বৃহদাকার হলেও তা বাস্তবায়ন সহজসাধ্য হবে না। এ বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। কিন্তু সরকার ক্ষমতার দম্ভে সকলকে উপেক্ষা করার নীতি গ্রহণ করেছে। দেশ ও জাতিকে অতীতের বিভাজন ও বিভক্ত করা হয়েছে। দেশের বৃহত্তর ইসলামী ব্যাংকে তারা লুটেরা ও নৈরাজ্যবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার অপতৎরতা শুরু করেছে। আর তা অব্যাহত থাকলে সরকার ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়ন করা কোন ভাবেই সম্ভব হবে। জনগণের ঐক্য ছাড়া এ সরকারেরর পক্ষে কোন বাজেটই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তিনি জনগণকে আস্থায় নিয়ে সরকারকে ইতিবাচক রাজনীতিতে ফিরে আসার আহবান জানান।

প্রসঙ্গত, গতকাল জাতীয় সংসদে দুপুর ৩টায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।