২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। তবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বলে মনে করে সংগঠনটি। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত তাৎক্ষণিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিসিসিআইর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। অন্যদিকে ঘাটতি অর্থায়নে ঋণনির্ভরতা ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের জন্য ইতিবাচক নয়।
তবে পরিচালন ব্যয় কমানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনটি। এছাড়া ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করা হলেও চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ হওয়ায় বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ডিসিসিআই। তাদের মতে, বড় বরাদ্দের চেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ডিসিসিআই। সংগঠনটি বলেছে, উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক। একই সঙ্গে শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা, ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ০.৫ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে কর সুবিধা প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
তবে মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা এবং সর্বোচ্চ আয়কর হার ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করায় হতাশা প্রকাশ করেছে ডিসিসিআই। সংগঠনটির দাবি, ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা করা উচিত। ক্যাশলেস লেনদেন সম্প্রসারণে পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং আগাম কর প্রত্যাহারকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে ব্যবসায়ী নেতারা।
ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা ব্যবস্থাকেও স্বাগত জানিয়েছে ডিসিসিআই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার এবং প্রযুক্তিপণ্যে কর হ্রাস দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করে ডিসিসিআই। একই সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপন, স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা এবং ই-বাইক শিল্পে রেয়াতি সুবিধাকে শিল্পায়নের জন্য সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানি খাতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি, নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর কমানো এবং চার্জিং অবকাঠামো আমদানিতে কর শূন্য করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ডিসিসিআই। তবে গ্যাস অনুসন্ধানে আরও বেশি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি মূল্য কাঠামো প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, সাত দিনের মধ্যে ওয়ার্ক পারমিট প্রদান, বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং উৎসে কর কর্তনজনিত ব্যয় অগ্রহণযোগ্যতার বিধান বাতিলকে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছে ডিসিসিআই।
সংগঠনটির মতে, বাজেটে ব্যবসাবান্ধব অনেক উদ্যোগ থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কাক্সিক্ষত সুফল বয়ে আনবে।