রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার। এর ফলে হাসপাতালটিতে নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ থাকবে এবং ভর্তি থাকা রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স বাতিল ঘোষণার পরই হাসপাতাল ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর হাসপাতালের প্রতিটি ফটকে বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ১৯৮২ সালের মেডিকেল প্র্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালকে দেওয়া শোকজ নোটিশের জবাব কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
আদেশে বলা হয়, গত ২৭ মে হাসপাতালে এক ওয়ার্ডে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত এক তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ওয়ার্ডে অক্সিজেন স্বল্পতা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে এ মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালটির লাইসেন্স কেন বাতিল হাবে না, এ মর্মে একটি শোকজ নোটিশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নোটিশের জবাব দিতে তাদের ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হলেও আরও ৪৮ ঘণ্টার সময় চেয়ে আবেদন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে গত ৯ জুন শোকজ নোটিশের লিখিত জবাব দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সে জবাববে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ায় The Medical Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, ১৯৮২ এর ১১(২) (খ) ধারা অনুযায়ী আপনার হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হইল।
তবে অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে আদেশে।
লাইসেন্স বাতিলের পর রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ থাকবে। তবে ভর্তি থাকা রোগীদের বিষয়ে মানবিক বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
এক্ষেত্রে ভর্তি রোগীদের লাইসেন্সপ্রাপ্ত অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আর প্রয়োজনে রোগী ও তাদের পরিবারের অনুরোধ পেলে স্বাস্থ্য অধিদফতরও সহায়তা করবে। হাসপাতালটির বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে তিনি জানান, বিষয়টি বর্তমানে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং নির্ধারিত বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
গত ২৭ মে সকালে হাসপাতালটির পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়। যাদের প্রত্যেকের বয়স ছিলো এক থেকে ৪ দিনের মধ্যে। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি রিপোর্টে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও ওয়ার্ডে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনও ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকা, বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই শিশুগুলোর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে ভোররাতে আদ-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতক ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর সরকার একাধিক তদন্তকমিটি করে। তাদের প্রতিবেদনে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক-নার্সদের অবহেলাকে দায়ী করা হয়।
কর্মচারীদের বিক্ষোভ
এদিকে লাইসেন্স বাতিল ঘোষণার পরই বিক্ষোভ করছেন হাসপাতালটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণার পরপরই গতকাল বিকালে নিরাপত্তার জন্য হাসপাতাল ঘিরে মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর সদস্যদের।
এদিকে হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজনরাও। তারা চিকিৎসাসেবার কথা বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পূর্ণবিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, একটি অনাকাক্সিক্ষত ভুলে বা দোষে হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ জন্য হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে কেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মারা যাওয়া নবজাতকদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে একটি সমঝোতায় এসেছে ইতোমধ্যে। ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি এমন অনাচার করা সরকারের ঠিক হয়নি।
বিক্ষোভরতদের একজন মো. সোহাগ। তিনি বলেন, দেশের অন্য বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা বেশ ভালো। খরচও তুলনামূলক কম। এছাড়া হাসপাতালের পরিবেশও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এ জন্যই এখানে আমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। মাসুদের মতো আরও অনেক রোগীর স্বজন হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ করছেন। তাদের বিক্ষোভের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন হাসপাতালের কর্মচারীরা।
এদিকে লাইসেন্স বাতিল ঘোষণার পরই আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। মতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। হাসপাতালের প্রতিটি ফটকেই রয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি।
রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাহাত খান বলেন, লাইসেন্স বাতিল ঘোষণার পর নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালকে দেওয়া শোকজ নোটিশের জবাব কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদফতর।