ডক্টর বি এম শহীদুল ইসলাম

যুদ্ধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব অপরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চীন সফর শেষ হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ১৪ মে তার এ সফর শুরু হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদে এটি তার দ্বিতীয় চীন সফর। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৭ সালে তিনি চীন সফর করেছিলেন। দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে তিনি এ সফর করেছেন। ১৪ মে বৃহস্পতিবার সকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ের গ্রেট হলে পৌঁছালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং তাকে স্বাগত জানান। এ সময় ট্রাম্পকে গার্ড অফ অনার দেয়া হয়। বৈঠকে যোগ দেয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে শি জিন পিং বলেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্রর স্থিতিশীল সম্পর্ক পুরো বিশ্বের জন্য ইতিবাচক। যখন আমরা সহযোগিতা করি, তখন উভয় পক্ষই লাভবান হই। যখন মুখোমুখি অবস্থান নিই, তখন উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হই। শি জিন পিংকে উদ্দেশ্য করে ডোনান্ড ট্রাম্প বলেন, আপনি একজন মহান নেতা। মাঝে-মধ্যে মানুষ আমার মুখে এ কথা শুনতে পছন্দ করে না। তারপরও আমি বলি। বেইজিংয়ের গ্রেট হলে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সাথে প্রায় দুই ঘণ্টা দ্বিপক্ষীয় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিশ্বের এই দুই শীর্ষ নেতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ইরানযুদ্ধসহ নানা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে আলোচনা করেন। বিশ্বের এ দুই পরাশক্তির মধ্যে এমন সময় বৈঠক হয়েছে, যখন ইরানযুদ্ধের কারণে বিশ্ব টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। তাদের এ সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক নিঃসন্দেহে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সাধারণত যুদ্ধবিরোধী হিসেবে ধরা হয়। তবে সরাসরি ইরানকে আক্রমণ করে তিনি এ মনোভাবকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন। বলা হয়ে থাকে, অসভ্য ও বর্বর ইসরাইলের প্ররোচণায় পড়ে তিনি এ যুদ্ধে জড়িয়েছেন। তবে ইসরাইলের খপ্পরে পড়ে যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তো পরাভূত করতে না পেরে উল্টো নিজে লেজ গুটিয়ে নিয়েছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের রীতিমতো পরাজয় হয়েছে। আমরা বিশ্ববাসী যদি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যাবে, এ পর্যন্ত তারা যতগুলো যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়েছে, তার সবগুলোতেই নাকানি চুবানি খেয়ে পরাজিত হয়ে ফিরতে হয়েছে। তারপরও তাদের কোনো চক্ষুলজ্জা বলতে কিছু নেই। প্রবাদবাক্যে বলা হয়ে থাকে, “এক কান কাটা ব্যক্তি গ্রামের বাইরে দিয়ে যায়, আর দুই কান কাটা ব্যক্তি গ্রামের ভিতর দিয়ে যায়”। ট্র্যাম্পের অবস্থা ঠিক ওই রকম। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যেমন- ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া কোথাও যুক্তরাষ্ট্র জয়লাভ করতে পারেনি। আফগানিস্তানে বিশ বছর যুদ্ধ করেও রাতের আঁধারে তাকে পালাতে হয়েছে। সর্বশেষ ইসরাইলকে সাথে নিয়ে ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে কি অবস্থা হয়েছে, তা বিশ্ববাসী দুই নজর খোলা রেখে জেনেছে। এখন এ যুদ্ধ থেকে কিভাবে মান-সম্মান বাঁচিয়ে ফেরা যায়, সেই পথ খুঁজছেন ট্রাম্প। এ পথের সন্ধান হিসেবে তিনি ইরানের বন্ধুপ্রতীম দেশ চীন সফর করেছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে না জড়িয়ে যদি শান্তির স্বপক্ষে থাকতেন, তাহলে তার সুনাম, খ্যাতি, মূল্যবোধ সবই ঠিক থাকত এবং বৃদ্ধি পেত। ট্র্যাম্প শান্তিরদূত হিসেবে উপাধি পেতেন। কিন্তু সে সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। অন্যদিকে, চীন সবসময়ই যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে চলেছে। তারা কখনো যুদ্ধে জড়ায়নি। কারো ওপর অবৈধভাবে আগ্রাসী হামলা করেনি, কোনো দেশের ওপর আগ্রাসন চালায়নি, জবরদখল করেনি। তারা সবসময়ই শান্তির স্বপক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। ইরানযুদ্ধেও তারা জড়ায়নি। বরং যুদ্ধবন্ধে নেপথ্য ও প্রকাশ্যে ভূমিকা নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে এক নম্বর দেশ হলেও চীন তার চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। চীনের সামরিক শক্তি কম নয়। ইতোমধ্যে তারা নিজেদেরকে বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিতে পরিণত করেছে। তার এ শক্তি অর্জিত হয়েছে যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং শান্তির স্বপক্ষে থেকে অর্জিত হয়েছে। চীন যুদ্ধ করছে অর্থনীতি নিয়ে, যাকে অর্থনৈতিক যুদ্ধ বলে। শান্তি ও সমৃদ্ধির এ যুদ্ধে দেশটি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে চীন নিজের এবং সেসব দেশের স্বার্থে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য করছে না। আমার জানা ও দেখা মতে, চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে। কয়েকটি দেশে দেখেছি, চীনের পণ্য এতো বেশি সমাহার কল্পনাই করা যায় না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মার্কেটে চীনের পণ্যের সয়লাব বয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতা দিয়ে চীন বিশ্বে ক্রমাগতভাবে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে চীন আজ বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুদ্ধে মানুষ হত্যা, বিপুল সম্পদ ও অর্থহানি ছাড়া কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। যুদ্ধ মানেই অশান্তি আর বিপর্যয়। যুদ্ধ পারস্পরিক ঘৃণা, বিভেদ ও বিভক্তি তৈরি করে বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ইরানযুদ্ধ পুরো বিশ্বকে যেভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে এবং স্নায়ুবিক যুদ্ধের মধ্যে রেখেছে, তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশলতার জন্য দ্রুত এর অবসান হওয়া জরুরি। কারণ যুদ্ধ মানেই বিশ্বব্যাপী বড় ক্ষতির উৎস তৈরি করা, মানুষের ভোগান্তি আর কষ্টের সীমা থাকে না।

এদিকে বিশেষ সূত্রমতে জানা যায়, এ বছরে অর্থাৎ ২০২৬ সালের সেপ্টম্বরের দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর করার কথা রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম দুই প্রধান পরাশক্তির শীর্ষ নেতাদের পারস্পরিক সফর বিনিময় সৌহার্দ্য ও ভালোবাসা বিশ্বশান্তির ইঙ্গিত বহন করে। বিশ্ববাসীর একান্ত প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈঠক যুদ্ধমুক্ত বিশ্ব গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে রুশ সংবাদমাধ্যম ইঙ্গিত দিয়েছে যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এ মাসে কিংবা এ বছরের শেষ দিকে চীন সফর করতে পারেন। তবে একথা মনে রাখা উচিত যে, চীন এবং রাশিয়ার সম্পর্ক গভীর। তাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের মধ্যেই পুতিনের এ সফরের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, যা একটু ভেবে দেখার বিষয়। পুতিনের সফরের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে- চীন ও রাশিয়ার মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করা। বলা যায়, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় পরাশক্তিগুলো যখন এক হয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে তখন তা বিশ্বের জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠে। বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ বিশ্ব পরিবেশ নিশ্চিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি তার প্রদর্শন না করাটাও শান্তি প্রতিষ্ঠার নমুনা। তার মাধ্যমেই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বিশ্বনেতাদের পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব থাকলে গোটা পৃথিবীতে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়। এতে করে উভয়দেশ যেমন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে উপকৃত হবে, তেমনি বিশ্বের অপরাপর দেশগুলোও উপকৃত হবে। উভয় ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক শক্তিতে একটা ভারসাম্য তৈরি হবে। বিশ্বশান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর দায়িত্বের পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তির দেশগুলোরও ভূমিকা রাখা জরুরি। আমাদের এ উপমহাদেশে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত অনেকটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কখনো কখনো তা যুদ্ধ ও আগ্রাসী রূপ লাভ করে। এতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে যা কাম্য নয়। আবার ভারতের সাথে চীনের দূরত্ব এখনো কমেনি বলে লক্ষণীয়। পাকিস্তানের সাথে ভারতের দূরত্ব থাকলেও সম্প্রতি বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সুসম্পর্ক গড়ে উঠা অসম্ভব কিছু নয়। আর সেটা হওয়া যুক্তিসঙ্গত। কারণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা উচিত। এক্ষেত্রে সার্কভুক্ত দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সার্ককে কার্যকর ও গতিশীল করতে পারলে, তা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্যোগ নিলে সার্ককে শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে। প্রয়োজনে তিনি এ ব্যাপারে বিরোধী দলের সাথে মত বিনিময় করতে পারেন।

এমতাবস্থায় গোটা বিশ্বে বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিন পিং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবেন। সেই সাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন সংযুক্ত হলে ইরান প্রশ্নে ট্রাম্প কিছুটা শান্ত হবেন বলে মনে হয়। ফলে যুদ্ধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ভারতের পক্ষ থেকে চীন প্রশ্নে উগ্রবাদী মনোভাব পরিহার করা হলে এবং বাংলাদেশের সাথে ভারত আধিপত্যবাদ, মুসলিম নিধন ও বৈরিতা পরিহার করলে এ অঞ্চলে শান্তির ফল্গুধারা প্রবাহিত হবে এবং বিশ্ব পরিমন্ডলে অবারিত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ গবেষক ও কলামিস্ট।