ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ২৭জন ভারতীয় নারী পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করেছে বিএসএফ এবং বিজিবি তা প্রতিহত করেছে বলে আমাদের সংবাদদাতারা জানান। এই ভারতীয় অপতৎপরতা রোধে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনগণ বিজিবির সঙ্গে অতন্দ্র প্রহরীর মত কাজ করে যাচ্ছে। গত দুইদিন ধরে, ঠাকুরগাঁও সীমান্তে গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১ জন, পাটগ্রম সীমান্তে ১০ জন এবং মেহেরপুর সীমান্তে দিয়ে ৬ জনকে পুশইন করার চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ)।

ঠাকুরগাঁও সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা

গর্ভবতী নারী ও চার শিশুসহ ১১ জন ৪০ ঘণ্টা যাবত খোলা আকাশের নিচে

ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা: ভারতের কলকাতার একটি স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া ছাত্রী রোজিনা আক্তার। সেখানে বাবা মা আর পাঁচ ভাইবোন নিয়ে সুখেই কাটছিলো তাদের। সম্প্রতি ভারত সরকারের অমানবিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাবা-মা বোনসহ ১১ জনকে বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও সীমান্তে পুশইন করার চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। যে চোখে একসময় স্বপ্ন দেখতো লেখাপড়া করে অনেক বড় হবে, আজ সে চোখেই পানির সাথে জমাট বেধেছে ভয় আর নিরাপত্তাহীনতার।

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাও সীমান্তে শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটায় নারী পুরুষ ও শিশু সহ ১১ জনকে পুশইন করার চেষ্টা করে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ। ৪০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও (রবিববার সন্ধ্যা পর্যন্ত) হয়নি সমাধান। দুইবার পতাকা বৈঠকের মাধ্যমেও মিলছে না কোন সুরাহা। ফলে তিন দিন ধরে সীমান্তের শূন্য রেখাতে দুর্বিষহ কষ্টে সময় কাটছে তাদের। কখনো প্রখর রোদে পুড়ছে শরীর, আবার কখনো বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু অবস্থা। খাওয়া, গোসল ছাড়াই বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই করছে প্রতিক্ষণ। ঠাকুরগাঁও মশালগাঁও সীমান্তের গ্রামবাসীরা মানবিক দৃষ্টিতে কিছু শুকনো খাবার পৌঁছে দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ক্ষুধা তৃষ্ণায় প্রতিবন্ধী শিশু, আর ৯ মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা নারীর চোখে মুখে ভয় আর আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। তারা জানে না এর শেষ পরিণতি কি হবে। কী আছে ভাগ্যে। শুধু দ্রুত বাড়ি ফেরার আকুতি তাদের কণ্ঠে।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, গত ৫ জুন দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত পিলার ৩৪৯/৭-এস এর কাছে বিএসএফ ১১ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। খবর পেয়ে বিজিবির একটি টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের শনাক্ত করে এবং বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেয়। তাদের মধ্যে ৩ জন পুরুষ, ৪ জন নারী ও ৪ জন শিশু রয়েছে। বর্তমানে তারা ভারতীয় সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৫০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তিরা জানান, তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দমদম এলাকায় বসবাস করতেন। গত ২৬ মে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের হেফাজতে নেয় এবং একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখে, যেখানে আরও প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জন অবস্থান করছিলেন। পরে তাদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

তাদের দাবি, ভারতীয় পুলিশের একটি গাড়িতে করে ৮৭ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের বহরগাঁও ক্যাম্পে নেওয়ার পর একদিন সেখানে রাখা হয়। পরে ৬ জুন রাতের দিকে সীমান্তের দিকে পাঠানো হলে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়।

এ বিষয়ে দিনাজপুর বিজিবি (৪২ ব্যাটালিয়ন) এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, ঘটনাটি নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হলেও কোন সমাধান হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি দুপক্ষের পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে দ্রুত একটি সমাধানের। সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা রয়েছে এবং টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

পাটগ্রাম সিমান্তে আবারও পুশ ইনের চেষ্টা বিএসএফের : সতর্ক অবস্থানে বিজিবি

পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) থেকে মো: হাবিবুর রহমান হাবিব : বি এস এফ এর পুশ ইন যেন থামছেই না। দেশের অন্যান্য সিমান্তের মত লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন সিমান্ত এলাকা দিয়ে গত কয়েক দিন থেকে একের পর এক ভারতীয় বিএসএফ এর পুশ ইন অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এতে সিমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত বৃহস্পতিবার ভোর রাতে উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের পঁয়ষট্টিবাড়ী কামাতটারী এলাকা দিয়ে ভারতীয় ১০ নাগরিককে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে ভারতের কোচবিহার রাজ্যের মাথাভাঙ্গা থানার পানিশালা সীমান্তের ভারতের ৯৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মহানদী ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা। এসময় তারা ৫ জন নারী, ৩ জন পুর“ষ ও ২ ছেলে শিশুকে ঠেলে দেয়। কিন্তুু এতে বাধ সাধে বিজিবির পঁয়ষট্টিবাড়ী ক্যাম্পের টহল দলের সদস্যরা। তারা পুশ ইনের বিষয়টি টের পেলে পিছু হটে বি এস এফ। পরে গত শুক্রবার স্থানীয় জনতাসহ দিনভর সিমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারী রাখে বিজিবি। বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সিমান্তের নোম্যাস ল্যান্ডে অবস্থানরত নাগরিকদের রাতের আঁধারে সরিয়ে নিয়ে যায় বিএসএফ। এদিকে আবারও গত শনিবার মানসিক ভারসাম্যহীন’ এক ব্যক্তিকে পুশ ইনের (ঠেলে পাঠানো) চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বিরুদ্ধে।

বিজিবি ও স্থানীয়দের সুত্রে জানা গেছে, বিকাল আনুমানিক ৫ টার দিকে উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের আজিজপুর(সাপ্পার বাড়ী) সীমান্ত এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মেইন পিলার ৮৫৫ নম্বরের ৫ নম্বর সাব পিলার সংলগ্ন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলার মাথাভাঙ্গা থানার পকেটপাড়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে শনিবার বিকেলে ভারতের ১৫৬ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের দাউয়াকামারী ক্যাম্পের টহল দলের সদস্যরা কাঁটাতারের বেড়ার গেট দিয়ে এক ব্যক্তিকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায়। বিষয়টি দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিক বিজিবিকে খবর দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় ৬১ বিজিবি (তিস্তা-২) ব্যাটালিয়নের কালীরহাট ক্যাম্পের টহল দলের সদস্যরা দ্র“ত ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হন। আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক যুবককে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে পাঠাতে দেখা যায়। ওই ব্যক্তির কথাবার্তা ও আচরণ অসংলগ্ন হওয়ায় তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন বলে ধারণা করা হয়। পরে বিজিবি সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল সংলগ্ন কাঁটাতারের বেড়ার একই পথে শূন্যরেখায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে দেন। এ সময় বিএসএফ তাঁকে আবারও ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করলে বিজিবি ও স্থানীয় লোকজন তা প্রতিহত করে। সর্বশেষ ওই ব্যক্তিকে ভারতের শূন্যরেখার প্রায় ১০০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করতে দেখা গেছে। একই দিন (শনিবার ৬জুন) রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে পাটগ্রাম উপজেলার কুচলিবাড়ী ইউনিয়নের পানবাড়ী বিজিবির আওতাধীন ৮১০মেইন পিলারের নিকটবর্তী গোলডাঙা সিমান্ত এলাকায় ভারতীয় ৩০ব্যাটালিয়ন জিগাবাড়ী ক্যাম্পের বিএসএফ জোয়ানেরা বেশ কয়েক জন ভারতীয় নাগরিককে সিমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশ ইন’র (ঠেলে পাঠানোর) জন্য জড়ো করে বলে জানা গেছে। এসময় স্থানীয় লোকজন বিষয়টি বিজিবিকে অবগত করলে বিজিবি ও স্থানীয়দের কঠোর নজরদারীর কারণে বিএসএফ পুশ ইন করতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে বিজিবি সিমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ বিষয়ে পানবাড়ী বিজিবির কোম্পানি কমান্ডার মো:সুলাইমান দৈনিক সংগ্রামকে জানান, গত শনিবার (৬জুন)রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে পানবাড়ী বিওপি সংলগ্ন গোল ডাঙা এলাকার সিমান্ত দিয়ে ভারতীয় বিএসএফ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে পুশ ইন করতে জড়ো করলে স্থানীয়দের নিকট খবর পেয়ে বিজিবি সিমান্তে যায় এবং স্থানীয় জনতাসহ বি এস এফ এর পুশ ইন অপপ্রচেষ্টা ব্যার্থ করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে সিমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

মেহেরপুরের তেঁতুলবাড়ীয়ায় সীমান্তের অবস্থান নেওয়া ৬ জনের ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ

মেহেরপুর সংবাদদাতা : মেহেরপুরের তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের ঠেলে দেওয়া ৬ জনের হদিস মিলছে না। গেল রাতের কোন এক সময় তাদেরকে সীমান্ত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ভারতীয় বিএসএফ তাদেরকে সরিয়ে নিয়েছে দাবি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির।

জানা গেছে, শনিভার ভোরে তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে ভারত থেকে ঠেলে দেওয়া ৬ জনকে প্রতিরোধ করে বিজিবি। বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশ ইন অপচেষ্ট ব্যর্থ হয়েছে। ভারত থেকে ঠেলে দেওয়া ৬ জন ভারতে ফিরে যেতে না পেরে অবস্থান নেয়

কাটাতারের বেড়ার পাশে ভারতীয় ভূখণ্ডে। দুই পরিবারের ৬ জনের মধ্যে ৩ জন পুরুষ, ২ জন নারী এবং ১ জন শিশু ছিল। সীমান্ত মাঠে পাট ক্ষেতের পাশে তারা শনিবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করে। বিজিবি ও গ্রামবাসী তাদের জন্য শুকনো খাবার ও পানি সরবরাহ করে। কিন্তু ভারতীয় বিএসএফ কাটাতারের বেড়া পেরিয়ে তাদের কোন খোঁজ নেয়নি। এ নিয়ে বিজিবি-বিএসএফ পতাক বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি। নিরুপায় হয়ে তারা মাঠের মধ্যেই রাত যাপনে বাধ্য হয়।

জানা গেছে, সন্ধ্যা থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত বিজিবির সাথে পাহারা করে গ্রামের লোকজন। এর পরে রাত তিনটার দিকে ৬ জননে আরও পাওয়া যানি। তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে না ভারতে ফেরত গেছে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৪৭ বিজিবি কুষ্টিয়ার সহকারি পরিচালক নুরুল হুদা জানান, রাত ৩টার পর থেকে তাদেরকে আর সেখানে পাওয়া যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে- বিএসএফ তাদেরকে

হবিগঞ্জের সীমান্তে কড়া নজরদারি, দিন-রাত টহলে ৫৫ বিজিবি

হবিগঞ্জ সংবাদদাতা : দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে জোরপূর্বক পুশ-ইনের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে ৫৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন। জেলার ১০৩ দশমিক ২ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় দিন-রাত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বাহিনীটি।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ৫৫ বিজিবির আওতাধীন ১৬টি সীমান্ত ফাঁড়ি (বিওপি) থেকে ২৪ ঘণ্টা টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সন্দেহজনক যেকোনো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এখন পর্যন্ত হবিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের পুশ-ইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি।

শনিবার দিবাগত গভীর রাতেও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক মাইকিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা হয়। পাশাপাশি উঠান বৈঠকের আয়োজন করে সীমান্তবাসীর মধ্যে পুশ-ইন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং দ্রুত তথ্য প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।

এ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণ, গ্রাম পুলিশ ও আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি ও স্থানীয়দের সমন্বিত উদ্যোগ ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

৫৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তানজিলুর রহমান বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রতিটি বিওপিতে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় জনগণ, গ্রাম পুলিশ ও আনসার-ভিডিপিকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের প্রতিটি অংশ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। রাত্রিকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থার্মাল ও ইনফ্রারেড ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”

বিজিবির এমন তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছেন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা।

চুনারুঘাট উপজেলার গুইবিল এলাকার বাসিন্দা মনির মিয়া বলেন, “রাতে নিয়মিত মাইকিংয়ের কারণে আমরা আরও সতর্ক হয়েছি। বিজিবির সদস্যরা দিন-রাত দায়িত্ব পালন করছেন, এতে আমরা নিরাপদ বোধ করছি।”

মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া এলাকার চা-শ্রমিক মোহন লাল বলেন, “উঠান বৈঠকে বিজিবি আমাদের পুশ-ইন সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়েছে। সন্দেহজনক কাউকে দেখলে কীভাবে তথ্য দিতে হবে, সে বিষয়েও পরামর্শ দিয়েছে। এতে আমরা নিজেরাও সচেতন হয়েছি।”

বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক সভা, প্রচার কার্যক্রম ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। জনসাধারণের সহযোগিতায় ২৪ ঘণ্টা সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং যেকোনো অনুপ্রবেশের চেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে কিশোরীকে ভারতে পাচারের চেষ্টা, বিজিবির হাতে আটক ১

নেত্রকোণা সংবাদদাতা: নেত্রকোণার দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে এক কিশোরীকে ভারতে পাচারের চেষ্টার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ সময় পাচারের শিকার হওয়া কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়েছে।

শনিবার সকালে নেত্রকোণা ব্যাটালিয়ন (৩১ বিজিবি) থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজিবি জানায়, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশ-ইন এবং মানবপাচার প্রতিরোধে নিয়মিত টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সকাল আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটে নেত্রকোণা ব্যাটালিয়নের ভবানীপুর বিওপির একটি টহল দল সীমান্ত মেইন পিলার ১১৫৬/৮-এস সংলগ্ন ফারংপাড়া গ্রামের বটতলা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানকালে বাংলাদেশ থেকে এক কিশোরীকে অবৈধভাবে ভারতে নেওয়ার চেষ্টার সময় সিলভার চাকমা নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে রাত্রি সরকার (১৪) নামে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। আটক সিলভার চাকমা দুর্গাপুর উপজেলার ভরতপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং উদ্ধার হওয়া কিশোরীর বাড়ি উপজেলার বরইগঞ্জ এলাকায়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিজিবি জানতে পারে, রাত্রি সরকারের অধিকাংশ আত্মীয়-স্বজন ভারতে বসবাস করেন। তাদের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সিলভার চাকমার সহায়তা নেন। এ সময় অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করলে বিজিবির টহল দলের হাতে তারা ধরা পড়েন।

নেত্রকোণা ব্যাটালিয়ন সূত্রে জানা গেছে, আটক ব্যক্তি ও উদ্ধার হওয়া কিশোরীকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্গাপুর থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

নেত্রকোণা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদুল বারী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবির তৎপরতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

খাদ্য পানি ও আশ্রয় নিশ্চিতে জাতিসংঘ ও আইওএম-এর হস্তক্ষেপের আহ্বান ব্যারিস্টার আরমানের : দেশের উত্তরের সীমান্তে পঞ্চগড়-নীলফামারী অঞ্চলে বড়বাড়ি ক্যাম্পের বিপরীতে শূন্যরেখায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ জন মানুষের ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলমান মানবেতর জীবনযাপনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম। গতকাল রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি জানান, ভাসমান এই মানুষগুলোর মধ্যে শিশু রয়েছে — খোলা আকাশের নিচে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা ছাড়া প্রতিটি ঘণ্টা তাদের জন্য জীবনঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রকাশিত সংবাদ ও ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের (নীলফামারী) অধিনায়কের বক্তব্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার ভোরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এই ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে। বিজিবির কঠোর অবস্থানে তারা প্রবেশ করতে পারেনি। এরপর কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হলেও বিএসএফ তাদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে দুই দেশের মধ্যবর্তী সীমান্ত বেষ্টনীতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তিন দিনের বেশি সময় ধরে তারা আটকে আছে। আজ দুপুরে আবারও তাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, এই মানুষগুলোর পরিচয়, নাগরিকত্ব ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণ মূলত দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার অভিবাসন ও সীমান্ত-ব্যবস্থাপনার বিষয়; তা প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক চ্যানেল ও বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যত সময়ই নিক, তা কখনোই এই মানুষগুলোর — বিশেষত শিশু ও নারীদের — মৌলিক মানবিক চাহিদা ও বেঁচে থাকার অধিকারের বিনিময়ে চলতে পারে না। আইনি পরিচয় যা-ই হোক, তারা মানুষ; তাদের প্রতি মানবিক দায় কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়।

তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি অবৈধ পুশইনের এই অমানবিক প্রবণতা বন্ধের জোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দুই দেশের প্রতি অনুরোধ করেন — পরিচয় ও দায় নির্ধারণের প্রশ্ন মীমাংসার আগেই যেন এই মানুষগুলোর কাছে অবিলম্বে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি আশ্রয় ও চিকিৎসা পৌঁছানো নিশ্চিত করা হয়, যেখানে শিশু ও নারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিশু অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক ন্যূনতম মানদণ্ড এ ক্ষেত্রে অবশ্যপালনীয়।

তিনি আরো বলেন, বিষয়টির মানবিক দিক বিবেচনায় আমি জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি এবং আটকে পড়া মানুষগুলোর কাছে অবিলম্বে মানবিক প্রবেশাধিকার ও মৌলিক সহায়তা নিশ্চিত করতে তাদের সদিচ্ছা ও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের জোর আহ্বান জানিয়েছি। বিরোধীদল হিসেবে আমরা ভুক্তভোগী এই মানুষগুলোর পাশে আছি এবং সরকারের প্রতিও সর্বোচ্চ জরুরি ভিত্তিতে কূটনৈতিক ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। মানুষের জীবন ও মর্যাদার চেয়ে বড় কিছু নয়।