তোফাজ্জল হোসাইন

শেখ সাদী রহ.-এর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা দিয়ে শুরু করতে চাই। শেখ সাদী খুবই সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। একবার এক দাওয়াতে তিনি ছেঁড়া ও নোঙরা কাপড় চোপড় পরে চলে গেলেন। তাই মেজবান তাকে চিনতে না পেরে ফকির ভেবে অপেক্ষাকৃত কম ও অনুন্নত খাবার দিলেন। শেখ সাদী বিষয়টি বুঝতে পারলেন। তিনি ওই কম ও অনুন্নত খাবার খেয়ে ফিরে এলেন এবং কিছুদিন পর আবার ভালো ও শাহেনশাহী কাপড় চোপড় পরে ওই বাড়িতে গেলেন। এবার তার সামনে সব উন্নত খাবার দাবার ও যথাযথ সম্মান দেখানো হলো। তিনি খাবার খেতে বসে কিছু খেলেন এবং কিছু খাবার তার পরনে পরা জামার পকেটে ঢুকালেন। এ অবস্থা দেখে মেজবান প্রশ্ন করলেন, জনাব এটি কি করছেন?

জবাবে শেখ সাদী রহ. বললেন, কিছু দিন আগে আমি এসেছিলাম, আমার শরীরে ছিল ছেঁড়া ও নোঙরা কাপড়। তাই আপনি আমাকে যেভাবে সম্মান দেখালেন এখন আমার বেশভূষার কারণে আমাকে তার ছেয়ে অনেক বেশি সম্মান দেখিয়েছেন। তাই ভাবলাম, এই সম্মান এবং খাবার দাবার আমার প্রাপ্য নয়, ওগুলো সব ওই বেশভূষার তথা পোশাকের প্রাপ্য। মেজবান খুবেই লজ্জিত হলেন। নিজের ভুল বুঝতে পারলেন।

শুধু ইউনিফর্ম বা পোশাকের রঙ বদল না করে; বরং সেবামূলক মনোভাব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পেশাদারিত্ব ও নৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসে।

সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন সময় সংস্কার বা পরিবর্তনের আলোচনাগুলোতেও একই বিষয় উঠে আসে যে, বাহ্যিক রূপের চেয়ে ভেতরের পরিবর্তনই কাম্য। ব্যক্তিগত ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনের গুরুত্ব বুঝতে হবে।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রাণ ঝরার পর থেকেই ইমেজ সঙ্কটে পড়ে এ বাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সংস্কারের পাশাপাশি পুলিশের পোশাক (ইউনিফর্ম) পরিবর্তনের দাবি ওঠে। তবে পোশাক পাল্টালেই পুলিশের স্বভাব পাল্টাবে কি না সে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, শুধু পোশাক নয়, সবার আগে পরিবর্তন আনতে হবে বাহিনীর স্বভাব, চরিত্র ও মানসিকতায়। সাধারণ মানুষের প্রতি বদলাতে হবে পুলিশের আচরণ। তা না হলে কেবল অর্থের অপচয় হবে। বাহিনীর মন-মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। এসব পরিবর্তন করা না গেলে শুধু পোশাক পরিবর্তন হলে তা আইওয়াশ মনে হবে। তাই পোশাক পরিবর্তনের মাধ্যমে গুণগত মানের কোনো পরিবর্তন হবে বলে সাধারণ মানুষ মনে করেন না। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার চ্যালেঞ্জটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দলবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, নারীলোভীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনাদরকার। সাধারণ নাগরিকের জীবনও যে পুলিশের জীবনের মতোই মূল্যবান তা অনুধাবনের মতো মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তবেই সফল ও সার্থক হবে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার উদ্যোগ।

ইউনিফর্ম পরিবর্তন করলে স্বভাবের কী পরিবর্তন হতে পারে তা নিশ্চিত নয়। যারা করছেন তারা বলতে পারবেন। ইউনিফর্ম পরার জন্য ওই ব্যক্তির কার্যকলাপ সম্পর্কযুক্ত মনে হয় না। তিনি যে কাপড় পরিধান করেন, সেই কাপড় তাকে নির্দিষ্ট করে দেয় না তার ব্যবহার-আচরণ কেমন হবে। ফলে বিপুলসংখ্যক সদস্যের পোশাক পরিবর্তন বাবদ একটি বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হবে। এটি আমাদের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কতখানি ঠিক হবে সেটি যারা দেশের ফাইন্যান্স সম্বন্ধে ভালো জানেন তারা ভালো বলতে পারবেন। আগেও অনেকবার পোশাক পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু পুলিশ বাহিনীর মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ ছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ আশা করেছিল পুলিশ বাহিনী হয়তো তাদের আচরণ পরিবর্তন করবে; কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিশেষ করে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে যমুনা ঘেরাও কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার ব্যানারে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের মারমুখী আচরণ প্রমাণ করে তাদের চরিত্র এখনো বদলায়নি।

তাই প্রশ্ন, এ মুহূর্তে পোশাক পরিবর্তন করা অগ্রাধিকার কি না। পোশাক পরিবর্তন করে পুলিশের ভেতর পরিষ্কার করতে পারবে কি না সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে। পুলিশের পরিবর্তন দরকার মানসিকতায়, এ জন্য দরকার যথাযথ কাউন্সেলিং ও ধর্মীয় জ্ঞান। পোশাক পরিবর্তন করে লাভ নেই। মানুষ পরিবর্তন না হলে পোশাক পরিবর্তন কোনো কাজে আসবে না।