অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করীম
নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুর গ্রামে ১৯৪৩ সালে মাওলানা রফিউদ্দীন আহমদ এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি বাল্যকালে গৃহ শিক্ষকের নিকট পবিত্র কুরআন শিক্ষা লাভ করেন। অত:পর তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা লাভ করে তিনি স্থানীয় মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে বামনিয়া আছিয়া সিনিয়র মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৪ সালে ফেনী আলিয়া মাদরাসা থেকে আলীম এবং ১৯৬৬ সালে নোয়াখালী কেরামতিয়া আলিয়া মাদরাসা থেকে ফাজিল পাশ করেন। অতপর ১৯৬৮ সালে কামীল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন।
১৯৬৪ সালে আলীম শ্রেণিতে অধ্যায়নকালে তিনি ছাত্র আন্দোলনে সংযুক্ত হন। ইসলামী আন্দোলনে নিবেদিত প্রাণ রফিউদ্দীন আহমদ ১৯৬৬ সালে ছাত্র সংঘের সাথী হন এবং একই বছর সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে সোনাপুর ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম ইসলামী ছাত্র সংঘের অফিস সেক্রেটারি এবং ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার ছাত্র সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখ্য বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পরও তিনি ইসলামী আন্দোলনের কাজ অব্যাহত রাখেন এবং পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। রফিউদ্দীন আহমদ ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামীর নোয়াখালী জেলার আমীর নিযুক্ত হন এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য নির্বাচিত হন। সংগঠনের কাজে প্রজ্ঞা, যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় এবং দক্ষতায় রফিউদ্দীন আহমদ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে ১৯৮৬ সালে তাকে নোয়াখালী জেলা থেকে কেন্দ্রীয় সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করে ঢাকায় আনা হয়। সেই সময় থেকে তিনি কেন্দ্রীয় সংগঠনের প্রদর্শনমূলক ও বহুবিধ দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করার চেষ্টা করতে থাকেন। অতপর তিনি কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনি অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাজে সর্বদা আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে ব্যস্ত থাকতেন। প্রদর্শনমূলক ও বহুমুখী প্রচারে তার মোটেই আগ্রহ ছিলনা। তিনি সদা সর্বদা সংগঠনকে মজবুত ও উন্নত করার চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন। একটা বিরাট ভবন তৈরির পিছনে যেমন হাজারো রাজমিস্ত্রী ও লেবারের ভূমিকা থাকে মুখ্য, পর্দার অন্তরালে থেকে জামায়াতে ইসলামীর সংগঠনের পিছন থেকে এমনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন রফিউদ্দীন আহমদ।
আমি বাংলাদেশ ইসলামী ইনষ্টিটিউটের সাথে জড়িত হই ১৯৯৮ সাল থেকে। ঐ সময়ে চেয়ারম্যান ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর জনাব শামসুর রহমান এবং জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন আব্দুল গফফার। বি,আই,আইয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ছিলেন মোহাম্মাদ ইউনুস, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, বদরে আলম, মাওলানা এবিএম আব্দুল খালেক মজুমদার ও এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম রেজা। তারপর থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বি,আই,আইয়ে যুক্ত হন পর্যায়ক্রমে মুহতারাম মকবুল আহমেদ, মাওলানা রফিউদ্দীন আহমদ, ডা. শফিকুর রহমান, আহমদ উল্লাহ ভূইয়া, মাওলানা এটিএম মাসুম, মো: আলতাফ হোসাইন, নুরুল ইসলাম বুলবুল, শহীদুল ইসলাম মক্কী, এডভোকেট মশিউল আলম, একেএম রফিকুন নবী, অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ, অধ্যক্ষ আব্দুর রব, মাওলানা আব্দুল মান্নান, আ.ফ.ম আব্দুস সাত্তারসহ আরো অনেকে।
২০০০ সালে জামায়াতের ঢাকা অঞ্চলের অঞ্চল সদস্য ছিলেন মাওলানা রফিউদ্দীন আহমদ। আমি তখন জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরার সদস্য ও মুন্সিগঞ্জ জেলা আমীর। তাই ঢাকা অঞ্চলে রফিউদ্দীন ভাইয়ের সাথে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়। তখন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা অঞ্চল পরিচালক ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ। পরবর্তীতে ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক হন মাওলানা রফিউদ্দীন আহমদ। ঐ সময়ে সাংগঠনিক কাজে তার প্রজ্ঞা ও দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করে। ২০০৮ জামায়াতের ঢাকা অঞ্চল পরিচালক মাওলানা রফিউদ্দীন আহমদকে আমরা বি,আই,আইয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হিসাবেও পেয়ে যাই।
পরবর্তীতে তিনি বিআইআইয়ের কেন্দ্রীয় তদারকী কমিটির সভাপতি ও বি,আই,আইয়ের ম্যানেজিং কমিটির ভাইস চেয়ারমান নির্বাচিত হন। তিনি ২০২৪ সাল পর্যন্ত বি,আই,আইয়ের ম্যানেজিং কমিটির ভাইস চেয়ারমানের দায়িত্ব দক্ষতা ও সফলতার সাথে পালন করেন। এ দীর্ঘ সময়ে আমি তার সাথে ঘনিষ্টভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাই। আমার নিকট তিনি ছিলেন আদর্শের মডেল ও আলোকিত ব্যক্তিত্ব। এ ধরনের ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও গুনান্বিত ব্যক্তিত্ব সব সময়ে পাওয়া দুষ্কার। যারা নিজ দায়িত্ব পালনকে জীবন্ত করে তুলতে এবং নিজ দায়িত্বাধীন সকল প্রতিষ্ঠানকে মজবুতী ও সম্প্রসারণ করে নীরবে ইসলামী আন্দোলনের প্রাণশক্তি বৃদ্ধি করার কাজে আত্ননিয়োগ করেছেন। তাদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মাওলানা রফিউদ্দীন আহমদ।
মাওলানা রফিউদ্দীন আহমদ ১৯৭৩ সালে ৩১ বছর বয়সে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে মনোয়ারা বেগমকে বিবাহ করেন। বিয়ের সময় মনোয়ারা বেগমের বয়স ছিলো ১৮ বছর। সে ছিলো তার আপন চাচাতো বোন। তাদের ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ে তারা সকলে সুশিক্ষিত ও বিবাহিত। তাদেরকে তিনি ইসলামী আন্দোলনের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে ইসলামী আন্দোলনের সাথে যুক্ত আছেন।
রফিউদ্দীন আহমদ ছাত্রজীবন থেকেই নিজেকে দ্বীন কায়েম করার জন্য সংগঠনের কাজে ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালার পাঠানো দ্বীন কায়েমের জন্য তিনি রাসূল (সা.) এর প্রদার্শিত পথেই আত্ননিয়োগ করেছিলেন। মাত্র ৩ মাস শিক্ষাকতা পেশায় কাজ করার পর আর কখনো কোন চাকুরি করেননি। তিনি সংগঠনের কাজের পাশাপাশি সমাজের কল্যাণমূলক কাজেও আত্মনিয়োগ করেন। যেমন-তিনি নোয়াখালী আল ফারুক একাডেমীর চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি আল ফারুক একাডেমী ও এয়াতীম খানা এবং আল ফারুক একাডেমী ট্রাষ্ট মসজিদ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করাসহ বিভিন্ন জনহিতকর কাজ করেছেন। তিনি ইন্তিকালের অনেক পূর্বেই হজব্রত পালন করেছেন।
জনাব রফিউদ্দীন সাহেব ২০২৫ সালের ৬ জুলাই ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।