পাকিস্তান ও অন্যান্য মিত্র দেশের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক' (Islamabad Memorandum) ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর একটি অত্যন্ত কার্যকরী প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা উন্নয়ন করবে না বলে সম্মত হয়েছে এবং উভয় দেশ এই কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে ৬০ দিনের নিবিড় আলোচনা শুরু করেছে।

১. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মজুত নিয়ন্ত্রণ

এই স্মারক অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তাদের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে সম্মত হয়েছে।

উচ্চমানের সমৃদ্ধকরণ বন্ধ: ইরান ৬০ শতাংশ বা তার বেশি বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে।

মজুত যাচাই: ইরান তার বর্তমান ইউরেনিয়াম মজুতের পরিমাণ আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ দেবে, যা আগে ছিল অত্যন্ত সীমিত।

২. আইএইএ (IAEA)-এর স্বচ্ছতা ও পরিদর্শনের সুযোগ

দীর্ঘদিন ধরে ইরান এবং আইএইএ-এর মধ্যে যে আস্থার সংকট ছিল, তা কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নিয়মিত পরিদর্শন: পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আইএইএ-এর পরিদর্শকদের প্রবেশের ওপর যে বিধিনিষেধ ছিল, তা শিথিল করা হবে।

স্বচ্ছতা: ইরান তার পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের একটি ‘ডিটেইলড রোডম্যাপ’ প্রদান করতে বাধ্য থাকবে, যা থেকে বিশ্ব জানতে পারবে তাদের সক্ষমতা ঠিক কতটুকু।

৩. ‘ব্রেকআউট টাইম’ (Breakout Time) বৃদ্ধি

পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে ‘ব্রেকআউট টাইম’ বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ অর্জনের সময়কাল একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

যদি ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া হ্রাস করে এবং মজুত কমিয়ে ফেলে, তবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের সময় বা ‘ব্রেকআউট টাইম’ বৃদ্ধি পাবে। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য স্বস্তির একটি বিষয়।

৪. চুক্তির স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব (৬০ দিনের পরবর্তী পর্যায়)

৬০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন সময়টি মূলত একটি ‘ট্রাস্ট-বিল্ডিং’ বা আস্থা অর্জনের পর্যায়। এর প্রভাবগুলো হতে পারে:

সফল হলে: যদি ৬০ দিনের মধ্যে এই স্মারক স্থায়ী রূপরেখায় রূপান্তরিত হয়, তবে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণভাবে ‘শান্তিপূর্ণ’ হিসেবে প্রমাণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অধীনে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আবদ্ধ হবে।

ব্যর্থ হলে: যদি এই সমঝোতা ভেস্তে যায়, তবে ইরান পুনরায় তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক দ্রুত শুরু করতে পারে। সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ‘পারমাণবিক দৌড়’ (Nuclear Arms Race) শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

৫. আঞ্চলিক শক্তির ওপর প্রভাব

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরার এই প্রচেষ্টা সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির জন্য সরাসরি প্রভাব ফেলবে:

আঞ্চলিক অস্থিরতা হ্রাস: ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে সরে এলে প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ কমবে।

নতুন সমীকরণ: পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকবে, যা অঞ্চলের অস্থিরতা কমানোর জন্য সহায়ক।