ইবরাহীম খলিল
জুলাই মানে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। আমরা আগামী ১০/১৫ বছর দেশকে এই জায়গাতে নিয়ে যেতে চাই। এজন্য আমরা এই সেক্টরগুলোতে ঐক্যবদ্ধ থাকবো। এখানে কোন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চলবে না। পক্ষপাতিত্ব চলবে না। এখানে ব্যক্তিগত কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নের কোন চিন্তা থাকবে না। কমপক্ষে কিছু জায়গায় যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি; সেই থাকার সম্ভবনা এবং সুযোগ এখনো আছে। তাহলে আমাদের প্রাপ্তির জায়গাটা আরও বিশাল হবে। ডাকসুতে বসে দৈনিক সংগ্রামের সাথে জুলাইকে মূল্যায়ন ও দেনা পাওয়া নিয়ে এমন কথাই বলেছেন ডাকসুর ক্যারিয়ার উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম। ২০২৪ সালের জুলইয়ের পর ভিন্ন রকমের ডাকসু পেয়েছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ।
ডাকসুর মাধ্যমে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের বিষয়ে মাজহারুল ইসলাম বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর জুলাইয়ের আকাক্সক্ষাকে সামনে রেখেই কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। কিন্তু সরকার এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে রকম সহযোগিতা পাওয়ার কথা ছিল; সেটা আমরা পাইনি। তারপরও জুলাইয়ের শত আকাক্সক্ষা বাস্তাবায়ন করতে না পারলেও আমাদের প্রচেষ্টার কমতি ছিল না। ডাকসুর পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চটা করেছি। তিনি বলেন, দেশের ইন্টারিম সরকারের সময় ডাকসুর প্রায় দুই ডজন প্রকল্প ছিল। এগুলো অনুমোদিত প্রকল্প। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর অনুমোদন হওয়া প্রজেক্টগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আমি বলবো বিশ^বিদ্যালয়ের অসহযোগিতা এবং সরকারের বাধায় আমাদের প্রজেক্টগুলো ব্যর্থ হওয়ার পথে। পরের ছয় মাসে এগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের আকাক্সক্ষা এবং জুলাই পরবর্তীতে নতুন ক্যাম্পাসের যে আকাক্সক্ষা সেটা আমরা পূরণ করতে পারতাম। অনেক বড় বড় প্রজেক্ট আটকে দেওয়া হয়েছে। এরপরও বিভিন্ন জায়গা থেকে ফান্ড ম্যানেজ করে এতো বেশি কাজ করেছি যে বিগত ডাকসুর চেয়ে বহুগুণ বেশি কাজ করেছি।
জুলাইয়ের শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাজহারুল ইসলাম বলেন, জুলাই আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দেয়। কিন্তু শিক্ষাটা কতটুকু কিভাবে নিতে পারছি সেটা হলো বিষয়। জুলাই আমাদের শিক্ষা দেয় ফ্যাসিবাদ যতই দীর্ঘায়িত হোক যত শক্তিশালী-ই হোক। তা আবার আন্দোলনকারীদের শিক্ষা দেয় যে আন্দোলন ছাড়া ফ্যাসিবাদ বিদায় হয় না। আন্দোলন ছাড়া জেল জুলুম অত্যাচার বৈষম্য দূর হয় না। দুইটা বিষয় উল্লেখ করার কারণ হলো আমাদের দেশ আবার ফ্যাসিবাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর আন্দোলনের ভাইয়েরা আন্দোলন থেকে বিমূখ হচ্ছে। আমরা যদি এভাবে ভুলে যেতে থাকি তাহলে অতীত আবার ভবিষৎ হয়ে আসবে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের স্মৃতি বলতে গিয়ে প্রথমে থামিয়ে দেন এই ডাকসু নেতা। কোনটা রেখে কোনটা বলবেন ঠিক করতে পারছিলেন না। কিছুক্ষণ থমকে থেকে তিনি শুরু করেন। ১৬ তারিখ দিবাগত রাতে আমরা হলগুলো থেকে ছাত্রলীগ বের করে দেয়ার প্লানেও আমিও ছিলাম। সাদিক কায়িম ভাই, এস এম ফরহাদ ভাই, মহি উদ্দীন ভাই আর আমি মোট চার জন। এক রুমে বসে প্লানিংয়ের পার্ট হতে পেরেছিলাম। হলগুলো থেকে ছাত্রলীগ কিভাবে বের করা যায়। আমরা ভাগ করে নিয়েছিলাম ওই রাতে। মহি উদ্দিন ভাই একাত্তর হল, আমার জসিম উদ্দীন হল, সাদিক কায়িম ভাই সূর্যসেন হল। ইচ্ছা ছিল যে কয়েকটা হল দিয়ে শুরু করা। এর আগেই রোকেয়া হল থেকে ছাত্রলীগ বের করে দেওয়া হয়। আমরা চাচ্ছিলাম সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে ছাত্রলীগ বের করা শুরুটা কিভাবে করা যায়; দুই একটা হলে শুরু হলে বাকীগুলো হয়ে যাবে বলেই আমরা ধারণা করেছিলাম। সেই টার্গেট নিয়ে চারটা হলে শুরু করলাম। সারারাত জেগে থেকে পরের দিন দিনের ১২টা পর্যন্ত যে বাস্তবায়ন সেটা একটা রোমাঞ্চকর বিষয় ছিল আমার কাছে।
আরোকটি ঘটনা। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার আমি অন দ্য স্পটে ছিলাম। চোখের সামনে এই যে বর্বর আক্রমণ; বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে, অনেকেই আমাদের ক্যাম্পাসের ছিল না অন্য ক্যাম্পাস থেকে এসেছিল। তারা ক্যাম্পাসের রাস্তাঘাট চিনতো না। তাদের ওপর যে বর্বর নির্যাতন সেটা আমাকে মাঝেমধ্যেই ভাবিয়ে তোলে। শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে বড় ফাঁদে আটকে যাই। ঢাকা মেডিকেলে সেদিনের দৃশ্য ছিল মাথা ফেটে হা করে আছে, কিন্তু সেলাই দিতে পারছে না। কেবল ব্যান্ডেজ করা হচ্ছিল আর সরিয়ে দিচ্ছিল। দেখলাম যে ঢামেকে হচ্ছে না। তখন প্রাইভেট একটা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় রিকশায় ওঠে যখন চানখাঁর পুলে আসছিলাম; দেখলাম ছাত্রলীগ মেডিকেল হামলা শুরু করছে। দুই পাশ থেকে মারামারি শুরু হয়ে যায়। সময়টা এমন ছিল যে ছাত্রলীগ যাকেই জুলাইয়ের পক্ষের বলে চিহ্নিত করতে পেরেছে, তাকেই প্রচ- মারধর করছিল। আমাদের সাথে মাথায় ব্যান্ডেজওয়ালা রোগী ছিল। নির্ঘাত মার খেতে বসেছিলাম। কিন্তু মিরাকললি হঠাৎ সুযোগ পেয়ে সিএনজি টান দিয়ে আমরা হামলা থেকে বের হয়ে গেলাম।