আর্থিক সংকটে কাটছাঁট হচ্ছে অনেক সুবিধা
শতভাগ মূল বেতন এক ধাপেই বাস্তবায়নের দাবি
বেতন বৃদ্ধিসংক্রান্ত হিসাব কষতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার
কামাল উদ্দিন সুমন
পে-স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির প্রতিবেদন চলতি মাসের মধ্যেই প্রস্তাব আকারে যাচ্ছে মন্ত্রিসভায়, সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত সচিব কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সোমবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেতন বৃদ্ধি, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, ভাতা কাঠামো এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়বে না। নি¤œ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হচ্ছে। কমিশনের আগের প্রস্তাব অনুযায়ী মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ ছাড়া ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য একাধিক বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ (এসআরও) জারির বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান,পে স্কেল বাস্তবায়নে তাড়াহুড়া করা হবে না। প্রতিটি প্রস্তাবের আর্থিক প্রভাব, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আইনগত দিক যাচাই করেই চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করা হবে।
চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে চায়। এর আগে আরও দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকগুলোতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাস্তবায়ন কৌশল এবং ধাপভিত্তিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা হবে। চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পর সেখানে প্রয়োজন হলে পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন করা যাবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নবম পে স্কেল কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেসামরিক সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
উল্লেখ্য, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গত ২১ এপ্রিল ১০ সদস্যের সচিব কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতিত্ব করছেন নাসিমুল গনি। এর আগে জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।
আর্থিক সংকটে কাটছাঁট হচ্ছে নবম পে স্কেল
আর্থিক সংকটের কারণে নবম পে স্কেলের আগের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কমে গেছে। রাজস্ব আয়ের চাপ, বাজেট ঘাটতি, ঋণ পরিশোধের দায় এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোয় কাটছাঁটের পথে এগোচ্ছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিভিন্ন গ্রেডের মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতাসহ কয়েকটি সুযোগ সুবিধা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। আগে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পুরোপুরি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই।
সূত্র আরও জানায়, বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীদের বেতন ও ভাতা তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে। অন্যদিকে ১ থেকে ১০ম গ্রেডের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম রাখার সুপারিশ করতে পারে সচিব কমিটি। যদিও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নে সফটওয়্যার, হিসাবরক্ষণ, পেনশন পুননির্ধারণ এবং বেতন সমন্বয়ের মতো কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতা রয়েছে। এসব সমস্যা কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়েও কাজ করছে সচিব কমিটি। এরই মধ্যে সচিবালয়ে সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে পে স্কেলের বিষয়টি তড়িঘড়ি নয়, বরং নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এগিয়ে নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি জুলাই মাসের শেষ নাগাদ সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে পারে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং সবশেষে গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়েই কার্যকর হবে নবম পে স্কেল।
শতভাগ মূল বেতন এক ধাপেই বাস্তবায়নের দাবি
নবম জাতীয় পে স্কেলে শতভাগ মূল বেতন এক ধাপেই বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে সরকারের কাছে দুটি প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। সোমবার সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক এসব প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দূর করার আহ্বান জানান এবং ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিবারের মৌলিক অধিকার ও প্রত্যাশা বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন।
সরকারি কর্মচারীরা বর্তমানে চরম হতাশার মধ্যে রয়েছেন উল্লেখ করে আব্দুল মালেক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নি¤œ বেতনভুক্ত কর্মচারীরা। ধারদেনার বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন অনেকেই।
তিনি বলেন, ১১ বছর পর দুটি পে স্কেল পাওয়ার সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখন সেই দুটি পে স্কেলের সমন্বয়ে নবম জাতীয় পে স্কেল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় বেতন কমিশনের কাছে সর্বনি¤œ ৩৫ হাজার টাকা মূল বেতনের প্রস্তাব দিয়েছিল সমিতি।
তিনি জানান, জাতীয় বেতন কমিশন বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে সর্বনি¤œ ২০ হাজার টাকা মূল বেতনের প্রস্তাব সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠন সেই প্রস্তাবকে সম্মান জানিয়েছে।
২২ লাখ পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আব্দুল মালেক বলেন, ১১ বছর পর যে পে স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে, সেখানে প্রস্তাবিত ২০ হাজার টাকা মূল বেতন সম্পূর্ণভাবে এক ধাপেই কার্যকর করা উচিত। তার ভাষায়, মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হবে এবং এতে কর্মচারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
তিনি আরও বলেন, প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করা হোক। অন্যদিকে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা দ্বিতীয় ধাপে দেওয়া যেতে পারে। তবে যদি রাষ্ট্রের আর্থিক সীমাবদ্ধতা বা অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে, তাহলে বিকল্প হিসেবে প্রথম ধাপে পুরো মূল বেতন, দ্বিতীয় ধাপে বাড়ি ভাড়া ভাতা এবং তৃতীয় ধাপে অন্যান্য ভাতা বাস্তবায়নের প্রস্তাবও সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
আব্দুল মালেকের ভাষ্য, এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি থাকবে না। তবে প্রথম ধাপেই পুরো মূল বেতন কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, পারিবারিক সচ্ছলতা বজায় রাখা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার স্বার্থেই একবারে শতভাগ মূল বেতন বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি সরকারের কাছে দুটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে।
সমিতির প্রথম প্রস্তাবে রয়েছে, প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন বাস্তবায়ন এবং দ্বিতীয় ধাপে সব ধরনের ভাতা প্রদান। দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে- প্রথম ধাপে পুরো মূল বেতন, দ্বিতীয় ধাপে বাড়ি ভাড়া ভাতা এবং তৃতীয় ধাপে অন্যান্য ভাতা সংযোজন করা যেতে পারে।
বেতন বৃদ্ধিসংক্রান্ত হিসাব কষতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার :
সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে-স্কেলের মূল বেতন ও সুযোগসুুবিধা বৃদ্ধিসংক্রান্ত হিসাব কষতে হিমশিম খাচ্ছে নির্বাচিত বিএনপি সরকার! এজন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি বারবার বৈঠক করেও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করতে পারছে না। সোমবার সচিবালয়ে এ-সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুপারিশমালা চূড়ান্ত করতে এ মাসে আরও দুই-তিনটি বৈঠকের প্রয়োজন হবে। মন্ত্রিপরিষদ ও অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে চলমান আর্থিক সংকটের কারণে ড. ইউনূস সরকার ঘোষিত পে-স্কেলের রূপরেখা সরাসরি বাস্তবায়ন করতে পারছে না নির্বাচিত সরকার। অনেকটা বাধ্য হয়েই কিছু কাটছাঁট করবে। এজন্য সুপারিশ করা গ্রেডগুলোতে মূল বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা এবং ভাতাদিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত পে-স্কেল বাস্তবায়ন তিন ধাপে করা হতে পারে।
যদিও এতে প্রযুক্তিগত কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেসব অসুবিধা কাটিয়ে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে সচিব কমিটি। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো হবে। পরে অন্যান্য সুবিধা কার্যকর করবে সরকার। তবে ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন দেখিয়ে সে হিসেবে বেতন-ভাতাদি প্রাপ্য হবেন সরকারি চাকুরেরা।
অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সচিব কমিটি এখনো সুপারিশমালা জমা দেয়নি। তাদের হয়তো আরও কিছু সময় লাগবে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা হয়তো এক বা দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সচিব কমিটি সে বিষয়টিও দেখছে।এখানে তিন ধাপ পর্যন্তও প্রয়োজন হতে পারে।
সরকারের অবস্থান কী?
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি বলেছেন, ‘ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি। শুধু জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে বেতন ও ভাতা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো হবে। পরে অন্যান্য সুবিধা কার্যকর হবে। তবে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে কিংবা বেতন বৃদ্ধির হার কত হবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সেই বাজেট ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তবে পে-স্কেলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি করা সম্ভব হয়নি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সহায়ক হবে। তবে পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য বাজারচাপ মোকাবিলা করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে