মোঃ কায়সার হামিদ (জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক ফুটবলার) ; বরাবর বেলজিয়াম দলটাকে আমি ‘কাগুজে বাঘ’ সম্বোধন করে এসেছি। অবজ্ঞায় নয় , বরং মনোবেদনায়। বিগত দেড় দশকে বেলজিয়াম ছিল তারকায় ঠাসা দল । গোলরক্ষক থিবাউ কর্তোয়া, ইডেন হ্যাজার্ড , ভিনসেন্ট কোম্পানি , রুমেলু লুকাকু , ইয়ান বারটনঘেন, ড্রাইস মার্টিনস , কেভিন ডি ব্রুইনদের মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে দীর্ঘদিন ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষে অবস্থান করেছে দলটি । কিন্তু ঐ পর্যন্তই । তারা জিততে পারে নি কোন আন্তর্জাতিক শিরোপা । অথচ তাদের বলা হতো ইউরোপিয়ান রেড ডেভিলদের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ডি ব্রুইন আর লুকাকুরা এসেছিলেন গোল্ডেন জেনারেশনের ক্ষয়িষ্ণু অংশ হয়ে। পারেন নি তারাও । স্পেনের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বেলজিয়ামের বিদায় ঘটেছে। আর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন নাম লিখিয়েছে সেমিফাইনালে। ইতোপূর্বে ফ্রান্সও মরক্কোকে হারিয়ে নিশ্চিত করেছে শেষ চারে খেলা।
হট ফেভারিট স্পেন দাপটের সাথে খেলেছে পুরো ম্যাচ। ৬৮% বল দখলে রাখা প্রতিপক্ষের পোস্টে অন টার্গেট শট নিয়েছে আটটি। সেখানে বেলজিয়ামের অন টার্গেট শট মাত্র দুটি । স্পেন যেখানে পাঁচটি কর্নার পেয়েছে , বেলজিয়াম পেয়েছে একটি । পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার , বেলজিয়াম খুব বেশী বেগ দিতে পারে নি স্প্যানিশদের। বরং ৩০ মিনিটে ফ্যাবিয়ান রুইজের গোলের ১০ মিনিট পর অনেকটা ধারার বিরুদ্ধে সমতা আনেন বেলজিয়ান চার্লস কেতেলায়েরে। পরবর্তী পুরো সময় বল দখল আর আক্রমণে থাকা স্পেন ৮৮ মিনিটে মিকেল মেরিনোর গোলে জয় পায়। এই জয় লা রোজাদের প্রাপ্য ছিল। পুরো সময় একটিবারের জন্য বেলজিয়ামের আক্রমণভাগ হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেনি স্প্যানিশ রক্ষণের জন্য । এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে ডি ব্রুইন , লুকাকু আর কর্তোয়াদের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেলো। লুকাকু বেলজিয়ামের জার্সিতে সর্বোচ্চ ৯৩ গোল করেছেন। চলতি বিশ্বকাপেও বদলী নেমে তিনবার জালের দেখা পেয়েছেন। কোন সন্দেহ ছাড়াই বেলজিয়ামের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার তিনি। ডি ব্রুইন সময়ের অন্যতম সেরা মধ্যমাঠের সেনানী । কর্তোয়াও বিশ্বসেরা গোলরক্ষকদের অন্যতম। নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপ ফুটবল মিস করবে বেলজিয়ান তারকাদের । আমি আশ করব , আন্তর্জাতিক ফুটবলটা কিছুদিন চালিয়ে যাবে তিন ফুটবলার । ২০১৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়ে সেরা সাফল্য পেয়েছিল বেলজিয়াম। সেই আসরে সেরা গোলরক্ষকের ‘গোল্ডেন গ্লোভ’ জিতেছিলেন কর্তোয়া । ফিফার সেরা একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন ডি ব্রুইন। আর লুকা মদ্রিচের পেছনে থেকে আসরের দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড় ছিলেন প্রাক্তন অধিনায়ক হ্যাজার্ড।
যাই হোক , যোগ্য দল হিসেবেই স্পেন সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলা স্পেনের । একটি ধ্রুপদী লড়াইয়ের আশা আমরা করতেই পারি । ১২ জুলাই আমাদের দেশের মধ্যরাত তিনটায় ইংল্যান্ড আর নরওয়ে মাঠে নামবে সেমির টিকেটের জন্য । নরওয়েজিয়ানরা ইতোমধ্যে ব্রাজিলকে বিদায় করে আসরের আলোচিত দলে পরিণত হয়েছে । আর্লিং হাল্যান্ড ৭ গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে শামিল। দলে ওডেগার্ড আর সরলথের মতো কুশলী খেলোয়াড় আছে। তবে গোলের জন্য নরওয়েকে তাকিয়ে থাকতে হবে হাল্যান্ডের দিকেই। অন্যদিকে, ৬ গোল করা হ্যারি কেইন ইংল্যান্ডের প্রধান ভরসা হলেও ইংলিশ স্কোয়াডে বৈচিত্রের অভাব নেই।জুড বেলিংহ্যাম, বুকায়ো সাকা, ডেক্লান রিসে আর গর্ডনরা দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। ইংল্যান্ডের কোচ থমাস তুঁশেল দক্ষ টেকনিশিয়ান । ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্লিং হাল্যান্ডদের বিশ্বকাপ অভিযাত্রা থমকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
একইদিন সকাল সাতটায় সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ফেভারিট। আট গোল নিয়ে লিওনেল মেসি গোল্ডেন বল আর গোল্ডেন বুটের দাবীদার হয়ে আছেন। তবে মেসির জন্য ব্যক্তিগত কোন পুরস্কার আর খুব বেশী মানে রাখে না। তিনি টানা দ্বিতীয় দফা দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিতে মরিয়া।লিওনেল স্কালোনির মতো মাস্টার মাইন্ড এবং লাউতারো মার্তিনেজ, জিওভান্নি লোসোলসো , এঞ্জো ফার্নান্দেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো আর লিসেন্দ্র মার্তিনেজরা ইতোপূর্বে দেশকে বিশ্বকাপসহ চারটি শিরোপা জিতিয়েছেন। ফের বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষুধা কমেনি তাদের। যদিও নকআউট রাউন্ডে কেবো ভার্দে আর মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে ঘাম ঝরিয়ে জিততে হয়েছে।তবে মিশরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও জয় পাওয়া আর্জেন্টাইনদের বাড়তি অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস । সুইসরা সহজ দল না। তারা মধ্যমাঠে আর্জেন্টিনাকে আটকে দেয়ার চেষ্টা করবে। তবে লিওনেল মেসির মতো ফুটবলের জাদুকর যে দলে আছে , তাদের আটকে দেয়া খুব সহজ না । হাল্কাভাবে নিচ্ছি না, তবু আমার মনে হয় , সুইজারল্যান্ড পারবে না আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে হারাতে। তাই আর্জেন্টিনাকে আমি সেমিতে দেখতে পাচ্ছি । আমি খুব করে ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনাকে মুখোমুখি দেখতে চাই সেমিতে । তাদের মধ্যে ‘ফকল্যান্ড দ্বীপ’ নিয়ে পুরনো রাজনৈতিক শত্রুতা আছে । ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলে হেরে যাওয়ার কথা আজও ভোলে নি ইংলিশরা। সেমিতে দুই দল মুখোমুখি হলে সেটা নতুন এক যুদ্ধ হিসেবেই গণ্য হবে , যা দেখতে চাইবে ফুটবলের যে কোন দর্শক।