অপেক্ষার পালা শেষ। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায় (আজটেকা স্টেডিয়াম) মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর। আজ বৃহস্পতিবার রাত ১টায় (বাংলাদেশ সময় : শুক্রবার) ম্যাচটি শুরু হবে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে এটি। ফুটবল শৈলী, নান্দনিকতা, ড্রিবলিং আর দারুণ কিছু গোলে মেতে থাকবে সারাবিশ্ব। কেউ জিতবে আবার আবার কেউ হারবে। এভাবেই এগিয়ে যাবে লড়াই। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মোট ১৬টি ভেন্যুতে চলবে ফুটবলের এই বিশ্ব আসর। গ্রুপ পর্বের পর ৪৮ দলের লড়াই নেমে আসবে ৩২ এ। এরপর ধাপে ধাপে ১৬ দলে নেমে আসবে খেলা। প্রি কোয়ার্টারের পর কোয়ার্টারের ৮ দল থাকবে শিরোপা যুদ্ধে। সেখান থেকে ৪ দল যাবে সেমিফাইনালে। দুই দলের লড়াই হবে ফাইনালে। এরপর আসবে সেই মহেন্দ্রক্ষণ। আগামী ১৯ জুলাই ৩৯ দিনের ১০৪ ম্যাচের রাত-দিনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফয়সালা হবে শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে ইতোমধ্যে উত্তর আমেরিকার তিন দেশই উৎসবের আমেজে উদ্ভাসিত হয়েছে। স্টেডিয়ামগুলো সাজানো হয়েছে নতুন রূপে, শহরজুড়ে উড়ছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পতাকা, চলছে সাংস্কৃতিক আয়োজন, কনসার্ট, ফ্যান ফেস্ট এবং নিরাপত্তা মহড়া।
প্রথমবারের মতো তিনটি ভিন্ন দেশে তিনটি জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠতে যাচ্ছে এই টুর্নামেন্টের। মেক্সিকো, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র এই তিন আয়োজক দেশের তিনটি ভিন্ন স্টেডিয়ামে ফুটবলপ্রেমীরা উপভোগ করবেন সংস্কৃতির এক দারুণ মেলবন্ধন ও বৈশ্বিক তারকাদের চোখ ধাঁধানো পরিবেশনা। প্রতিটি আয়োজক দেশের নিজস্ব উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক ৯০ মিনিট আগে এই অনুষ্ঠানগুলো শুরু হবে। বিশ্বকাপের এই উদ্বোধনী ত্রয়ীর সূচনা হচ্ছে আজ মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকাতে। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিটে শুরু হবে এই অনুষ্ঠান।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে মঞ্চ মাতাতে যাচ্ছেন কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা। আয়োজকরা নিশ্চিত করেছেন, বিশ্বখ্যাত এই তারকার সঙ্গে যৌথভাবে আরও অংশ নেবেন নাইজেরিয়ান আফ্রোবিটস শিল্পী বার্না বয়। তারা পরিবেশন করবেন এবারের আসরের অফিশিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’। জানা গেছে, মেক্সিকোর ঐতিহ্য ও আধুনিক ল্যাটিন সুরের মিশেলে সাজানো এই অনুষ্ঠানে আরও থাকছেন জে বালভিন, আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ, বেলিন্ডা, ড্যানি ওশান, লিলা ডাউনস, লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলেস, টাইলা এবং পপ ব্যান্ড মানার মতো জনপ্রিয় তারকারা। দ্বিতীয় উদ্বোধনী আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিটে কানাডার টরন্টোর বিএমও। কানাডিয়ান সংস্কৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরতে এই মঞ্চে পরিবেশনায় থাকবেন নোরা ফাতেহি, মাইকেল বুবলে, অ্যালানিস মরিসেট, এলিয়ানা, জেসি রেয়েজ, সঞ্জয়, ভেজিড্রিম, উইলিয়াম প্রিন্স এবং আলিসিয়া কারার মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা। সর্বশেষে শনিবার (১৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে বসবে উদ্বোধনী ত্রয়ীর শেষ আসর। হলিউড ঘরানার এই চোখ ধাঁধানো আয়োজনে মঞ্চ মাতাবেন কেটি পেরি, ব্ল্যাকপিংক ব্যান্ডের লিসা, ফিউচার, রেমা, টাইলা এবং অ্যানিত্তার মতো জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক তারকারা।
এদিকে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথমবারের মতো হাফটাইম শো অনুষ্ঠিত হবে। ফিফা ও গ্লোবাল সিটিজেন জানিয়েছে, ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালের হাফটাইম শোতে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকবেন শাকিরা, ম্যাডোনা এবং কোরিয়ান ব্যান্ড বিটিএসের মতো তারকারা। বলে রাখা যায়, পুরো টুর্নামেন্টের এই উদ্বোধনী পর্বগুলোর মূল থিম তৈরি করা হয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিকে কেন্দ্র করে, যা প্রতিটি দেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হবে। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগী টেলিভিশনের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এই জমকালো আয়োজন সরাসরি উপভোগ করতে পারবেন। এবারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামে। এর মাধ্যমে স্টেডিয়ামটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে অনন্য রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। এর আগে, ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপেরও উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করেছিল এই ভেন্যু। এবার তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সূচনা হবে ঐ একই স্টেডিয়ামে।
এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক শহর ১৬টি। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি কানাডার টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার এবং মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা ও মনতেরেই বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করবে। প্রায় এক দশকের প্রস্তুতির পর আয়োজক দেশগুলো স্টেডিয়াম সংস্কার, পরিবহন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ সম্পন্ন করেছে।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে পর্যটনেরও বিশাল জোয়ার দেখা যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ দর্শক ইতোমধ্যে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে পৌঁছাতে শুরু করেছেন। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও পর্যটন খাতে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিশ্বকাপ আয়োজক দেশগুলোর অর্থনীতিতে বিলিয়ন ডলারের প্রভাব ফেলবে।
তবে উৎসবের আবহের মধ্যেও রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ। মেক্সিকো সিটিতে বিশ্বকাপকে ঘিরে কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদও দেখা গেছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের চেয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যদিও আয়োজক কর্তৃপক্ষ বলছে, নিরাপত্তা ও শৃক্সখলা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং বিশ্বকাপ আয়োজন নির্বিঘœ হবে। ফিফা ইতোমধ্যে উদ্বোধনী ম্যাচের ম্যাচ অফিসিয়ালও ঘোষণা করেছে। ব্রাজিলের অভিজ্ঞ রেফারি উইলটন সাম্পাইও উদ্বোধনী ম্যাচ পরিচালনা করবেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রেফারি প্যানেল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবারের আসরে।
ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তারকাদের লড়াইও। বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের পাশাপাশি ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী দলগুলো ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শেষ করেছে। তরুণ ও অভিজ্ঞ তারকাদের সমন্বয়ে এবারের বিশ্বকাপকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী থেকে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত ফুটবলপ্রেমীরা প্রিয় দলের পতাকা টানাতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর প্রস্তুতি চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
সব মিলিয়ে, বৃহস্পতিবারের উদ্বোধনী ম্যাচ কেবল একটি ফুটবল খেলার সূচনা নয়; এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের যাত্রা। তিন দেশ, ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ এবং কোটি কোটি দর্শকের অংশগ্রহণে বিশ্ব ফুটবল প্রবেশ করছে নতুন এক যুগে। আর সেই যাত্রার প্রথম বাঁশি বাজবে মেক্সিকো সিটির আকাশে, যেখানে আবারও মিলিত হবে ফুটবল, সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক উৎসবের রঙ।