মোঃ কায়সার হামিদ (জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক ফুটবলার) : ফ্রান্স বনাম স্পেন। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের লাইনআপ। ফিফা র্যাঙ্কিং বিবেচনায় বর্তমানে বিশ্বের চারটি সেরা দলই উঠেছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। ইতোপূর্বে বিশ্বকাপের ইতিহাসে র্যাংকিংয়ের সেরা চার দল কখনও সেমিফাইনালে একইসাথে খেলেনি। এছাড়া, চলতি আসরের সেমিফাইনালিস্ট চার দলেরই রয়েছে বিশ্বকাপ জয়ের পূর্ব-অভিজ্ঞতা। চার বিশ্বচ্যাম্পিয়নের বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিতে খেলার ঘটনা আছে মাত্র দুবার। ১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, উরুগুয়ে ও ব্রাজিল এবং ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনা , ইংল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি খেলেছিল সেমিতে।
চলতি বিশ্বকাপের সেমিতে ওঠা চার দলের কাউকে এগিয়ে বা পিছিয়ে রাখার উপায় নেই। স্পেন বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। লামিনে ইয়ামাল, গাভি , পেদ্রি , রদ্রি , কুকুরেয়া, লাপোর্তে , ওয়ারজাবাল, রুইজদের নিয়ে লা রোজারা দুর্দান্ত একটি স্কোয়াড। যদিও ২০০৬ সালে বিশ্বকাপের একমাত্র দেখায় ফ্রান্সের কাছে ৩-১ গোলে হেরে নকআউট পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল স্পেন। কিন্তু ২০২৪ সালের উয়েফা ইউরো আর ২০২৫ সালের উয়েফা নেশন্স লিগ ফ্রান্সের বিপক্ষে জয় পেয়েছে লা রোজারা। দুটি ম্যাচই ছিল সেমিফাইনাল। ইতিহাস বলছে, দুই দলের ৩৮ দেখায় স্পেন জিতেছে ১৮বার আর ফ্রান্স ১৩বার। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে অতীত পরিসংখ্যান অবশ্য কোন কাজে আসে না। তাছাড়া যে দলে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ডেসায়ার দুয়ে আর র্যাবিওর মতো খেলোয়াড় আছে, তারা যে কোন দলকে ধ্বংস করতে সক্ষম।
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচ ইতোমধ্যে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়া মানেই ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসংগ চলে আসা। ব্রিটেন থেকে আট হাজার কিলোমিটার দূরে কিন্তু আর্জেন্টিনার লাগোয়া দ্বীপটি ইংল্যান্ডের শাসনে আছে ১৮৩৩ সাল থেকে। যদিও দ্বীপটিকে আর্জেন্টিনা বরাবর নিজেদের দাবি করে এসেছে। তাই নিয়ে ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা জড়ায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। সামরিক যুদ্ধে জিতেছিল ইংল্যান্ড। সেই যুদ্ধের পরাজয় কখনও ভুলবে না আর্জেন্টিনা। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের লড়াইয়ে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। দিয়াগো ম্যারাডোনা রেফারির চোখ এড়িয়ে হাত দিয়ে গোল করলেন। যে গোলটি তিনি ‘হ্যান্ড অফ গড’ আখ্যা দিয়ে আলোচিত হন। এছাড়া ম্যাচে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা গোলটিও করেন ম্যারাডোনা। গ্যারি লিনেকার ইংল্যান্ডের পক্ষে গোল করেছিলেন। কিন্তু ম্যাচ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার প্রয়াত অধিনায়ক ম্যারাডোনা সেই জয়কে বলেছিলেন ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ’!
১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচটি টেলিভিশনে দেখেছিলাম। দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব ছিল স্পষ্ট। ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটি এখনও হজম করতে পারে নি ব্রিটিশরা। ম্যাচটি রেফারির সহযোগিতায় আর্জেন্টিনা ছিনিয়ে নিয়েছে, অভিযোগ থেকে একচুল সরেনি তারা। সেই ইংল্যান্ড ফের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনার। ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসঙ্গ আর স্মৃতি আসবেই আর্জেন্টাইনদের মনে। ইংলিশদের মনে থাকবে ১৯৮৬ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধের স্পৃহা। আমি তো আশংকা করছি, মাঠের খেলার চেয়ে খেলোয়াড়রা পরস্পরের সাথে স্নায়ুবিক উত্তেজনায় জড়াবে। রেফারি কঠোর না হলে ম্যাচে ঘটতে পারে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা।
কোন সন্দেহ নেই , আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। চলতি বিশ্বকাপে আট গোল করে ফ্রান্সের এমবাপ্পের সাথে লড়াই করছেন গোল্ডেন-বুটের জন্য। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে মেসি গোল পান নি। ম্যাকঅ্যালিস্টার, আলভারেজ আর মার্তিনেজরা গোল পেয়েছেন। মেসি গোল না পেলেও আর্জেন্টিনা জিততে পারে, প্রমাণ হয়েছে। তা স্বত্ত্বেও আর্জেন্টিনার নিউক্লিয়াস মেসিই। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের রয়েছে হ্যারি কেইনের মতো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার। জুড বেলিংহ্যাম তো আগুণ ফর্মে আছেন। দুজনেই ছয়টি করে গোল করেছেন। বেলিংহ্যামকে ‘গোল্ডেন বল’ এ্যাওয়ার্ডের দাবিদার বলা হচ্ছে। ইংল্যান্ডের মূল কাজ যেমন হবে মেসিকে নিস্ক্রিয় রাখা, তেমনি আর্জেন্টিনার মূল কৌশল হবে কেইন আর বেলিংহ্যামকে আটকানো। ফুটবল গোলের খেলা। কিন্তু আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের লড়াইটা হবে রক্ষণ আর মধ্যভাগের।
ফ্রান্স-স্পেন আর আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দুটি ম্যাচেই কাউকে এগিয়ে রাখার উপায় নেই। তবে আর্জেন্টিনা ইতোপূর্বে চারবার বিশ্বকাপ সেমিতে খেলে কখনও হারে নি। আবার ফ্রান্স বিগত দুটি বিশ্বকাপে ফাইনালে খেলেছে। জার্মানি আর ব্রাজিলের পর টানা তিনটি ফাইনালে খেলার রেকর্ড গড়তে উন্মুখ দিঁদিয়ের দেঁশমের দল। ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড আর ২০১০ সালের শিরোপাজয়ী স্পেন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার অপেক্ষায় । কোন দুই দল খেলবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল জানা যাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে।