॥ আলী আহমাদ মাবরুর ॥
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্যরামচন্দ্রপুর (নয়াপাড়া) গ্রামে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির। গাইবান্ধার মতো একটি অনগ্রসর এ জনপদে গেল কয়েক বছরে একের পর এক বিশাল মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৮ ফুটের শিব এবং ৫৩ ফুটের কৃষ্ণের পর এবার রামমূর্তি নির্মাণের কর্মযজ্ঞ স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। যেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যালঘু, সেখানে এমন স্থাপনা নির্মাণের নেপথ্য কারণ, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এরই মধ্যে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। মন্দির প্রাঙ্গণে বিদেশি কূটনীতিকদের যাতায়াত এবং প্রশাসনকে অন্ধকারে রেখে এমন কর্মযজ্ঞ চালানোয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।
স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে গত ১১ জুন থেকে সেখানে চলমান আকাশচুম্বী রামমূর্তি নির্মাণের কাজ আপাতত স্থগিত রয়েছে। কিন্তু সরকারি এ সিদ্ধান্তের পরও ধোঁয়াশা কাটছে না। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের বিশাল এ কর্মযজ্ঞের আড়ালে কি নিছক ধর্মীয় আবেগ, নাকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এটি কোনো অশুভ ইংগিত? এ প্রকল্পের মূল কারিগর হরিদাস চন্দ্র তরণী। তার দাবি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সবজি সাপ্লাই দিয়ে তিনি পাঁচ কোটি টাকা আয় করেছিলেন। কিন্তু এ-সংক্রান্ত দলিল বা আয়কর নথি দেখাতে পারেননি তিনি। ভারত থেকে এসি মেরামতের প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে তিনি শেখ হাসিনার তৎকালীন বাসভবন তথা গণভবনের পাশের দোকানেই এসি মেরামতের কাজ নিয়েছিলেন। সে সুযোগে গণভবনে অবাধ যাতায়াত ছিল তার।
হরিদাসের সঙ্গে ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিয়েও এখন জোরালো আলোচনা চলছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের তার আস্তানায় ঘন ঘন যাতায়াত এবং রহস্যময় কর্মকা-ের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরকারের উচ্চমহলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভারতীয় হাইকমিশনের প্রভাব সীমিত করার জোরালো সুপারিশ করেছে। দৈনিক আমার দেশের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, বগুড়ার শিবগঞ্জের বাসিন্দা হরিদাস ক্লাস সিক্সে থাকতেই ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, সেখান থেকে ফিরে আসার পরই তার মধ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদের দীক্ষা ও কর্মতৎপরতা শুরু হয়।
এ মন্দির, সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অনুমতি না নিয়েই বিশাল মন্দির স্থাপন এবং সেখানে ভারতীয় নাগরিক ও দূতাবাসদের অবাধ যাতায়াত নিয়ে উদ্রেক হওয়া প্রশ্নগুলো এ সংকটের নেপথ্যে গভীর কোনো চক্রান্তের বার্তা দিয়েছে। এ বার্তায় আরো হাওয়া দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী। দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর বেশি বাড়াবাড়ি করা হলে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহায্য নিয়ে হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশের দাবি তোলা হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত এ সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন “আপনাদের বলতে চাই এ বাংলাদেশ আমার। আদি বাংলাদেশও আমার। আপনারা যদি বেশি বাড়াবাড়ি করেন, তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য চেয়ে আমরা আলাদা একটি প্রদেশ করব শুধুমাত্র সনাতনীদের জন্য।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখ-তা নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলা শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী নয়, এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতি অবমাননাও বটে। সম্প্রতি ভারতের কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদী মহলেও রংপুর কিংবা চট্টগ্রামকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা নিয়ে আলোচনা শোনা যাচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য রংপুর প্রয়োজন; কোথাও বলা হচ্ছে, ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল ভারতের অংশ হওয়া উচিত। এ ধরনের বক্তব্যকে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাগাড়ম্বর বলে উড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাস বলে, অনেক সময় চরমপন্থী ধারণা প্রথমে প্রান্তিক মতামত হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা রাজনৈতিক ভাষ্যে প্রবেশ করতে পারে। ফলে এসব বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের বক্তব্যের পেছনে প্রায়ই “সভ্যতার সাথে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র”, “ঐতিহাসিক অধিকার” কিংবা “ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বার্থ” ধরনের যুক্তি হাজির করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরেই “হিন্দু রাষ্ট্র” ধারণা প্রচার করে আসছে। যেমন, আখিল ভারত হিন্দু মহাসভা তাদের আদর্শিক নথিতে হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাকে সমর্থন করে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির মাদার অর্গানেইজেশন আরএসএস এর প্রতিষ্ঠাতা কেশাভ বালিরাম হেদগেওয়ার এবং পরবর্তী প্রধান চিন্তাবিদ এম এস গোলওয়াকারও এমন একটি সাংস্কৃতিক-সভ্যতাভিত্তিক ভারতের ধারণা প্রচার করে গেছেন, যা “অখ- ভারত” ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। আরএসএস-এর বিভিন্ন প্রকাশনা, বক্তৃতা এবং আদর্শিক আলোচনায় ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক একক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিশেষ করে গোলওয়ালকরের লেখনি Bunch of Thoughts এবং আরো কিছু লেখায় হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধারণা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আরএসএস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ও চিন্তাবিদ দীর্ঘদিন ধরে “অখ- ভারত”কে একটি আদর্শিক লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন। আরএসএস-এর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিগুলোতেও মাঝে মাঝে বিভক্তির পূর্ববর্তী উপমহাদেশের মানচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি শুধু তাত্ত্বিক আলোচনাতেই থেমে থাকেনি। ২০২৩ সালে ভারতের নতুন সংসদ ভবনে স্থাপিত একটি বৃহৎ ম্যুরাল বা চিত্রকর্ম, যেটিকে “অিখ- ভারত” মানচিত্র হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়, তা বাংলাদেশসহ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। মানচিত্রটিতে বর্তমান ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়। ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, এটি কোনো রাজনৈতিক মানচিত্র নয়; বরং প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিস্তৃতি তুলে ধরার একটি শিল্পকর্ম। কিন্তু তৎকালীন সময়েও বাংলাদেশসহ দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার বিশিষ্ট নাগরিকেরা ভারতের সেই দাবি প্রত্যাখান করে বলেছিলেন, এই ম্যাপটি কার্যত অখ- ভারতের আদর্শিক ধারণার প্রতীক।
বাংলাদেশের জন্য বিপদ কেবল সামরিক নয়, আদর্শিকও। যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরে অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখ- নিয়ে দাবি তোলা হয়, তখন তা দু’দেশের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার বিষয়টি এমনিতেই নানা সংকটে আক্রান্ত। এর মধ্যে সীমান্ত পরিবর্তন বা ভূখ- অধিগ্রহণের ধারণা নতুন অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। বাংলাদেশের অবস্থান এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। প্রথমত, রংপুর, চট্টগ্রাম কিংবা বাংলাদেশের কোনো অংশের মালিকানা নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্কের সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত ও জাতিসংঘ সনদ রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিকভাবে এ ধরনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আপত্তি জানাতে হবে। তৃতীয়ত, দেশের ভেতরে জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক শক্তি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুর্বল রাষ্ট্রের ভূখ- নিয়েই সাধারণত বেশি কল্পনা ও আগ্রাসী বক্তব্য দেখা যায়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের ভূখ- নিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মহলের বক্তব্যগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ‘অখ- ভারত’ ধারণা অনুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশের বর্তমান কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে কল্পনা করা হয়। যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভূখ- দখলের কোনো নীতি ঘোষণা করেনি, তবুও বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন, মতাদর্শিক প্ল্যাটফর্ম এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যে অখ- ভারতের ধারণা বারবার উঠে এসেছে। যেমনটা একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের কোনো অঞ্চল নিয়ে দাবি, কৌতুক, মানচিত্র প্রকাশ কিংবা দখলের আহ্বানকে শুধু আবেগতাড়িত মন্তব্য হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর সম্প্রসারণবাদী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ, বাণিজ্য, নদী, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু সেই সম্পর্ক কখনোই সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে অতিক্রম করতে পারে না। রংপুর নিয়ে যে ধরনের সম্প্রসারণবাদী বক্তব্য মাঝেমধ্যে শোনা যায়, তা যতই প্রান্তিক হোক না কেন, বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ স্বাধীনতা শুধু অর্জন করলেই হয় না, সেটিকে রক্ষা করার মানসিক প্রস্তুতিও সবসময় ধরে রাখতে হয়।
এর মধ্যে নতুন সংকট হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে পুশ-ইন ক্রাইসিস। কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাভাষী, বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ অনেক মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এসব প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করছে। ফলে অনেক পরিবার দুই দেশের সীমান্তের মাঝামাঝি ‘নো-ম্যানস ল্যান্ডে’ আটকা পড়ছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত বিএসএফের ২৩টি পুশ-ইনের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। খুব উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আলোচনার জন্য নোটিশ দেয়া হলেও রহস্যময় কারণে সরকার এই বিষয়ে আলোচনা করার সুযোগ দেয়নি। শুধু তাই নয়; নোটিশদাতা সংসদ সদস্যকে ডেকে নিয়ে স্পর্শকাতরতার অজুহাতে এই নোটিশটি প্রত্যাহার করে নিতেও বলা হয়েছে।
যদিও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে ভারত থেকে মানুষকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর (পুশ-ইন) ঘটনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী এ প্রসঙ্গে বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোর মৌলিক অধিকার উপেক্ষা করে তাদের বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে। তিনি বলেন, ভারতের উচিত এ ধরনের বেআইনি বহিষ্কার বন্ধ করা এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করা। এইচআরডব্লিউ তাদের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরির সময় এইচআরডব্লিউ এমন কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যারা সীমান্তে মানুষকে জোর করে পাঠানোর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিজিবি বাধা দেওয়ার পর বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের আবার ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। পাশাপাশি খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবা ছাড়া সীমান্ত এলাকায় মানুষকে ফেলে রাখা নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ। প্রতিবেদনে শিশুদের এভাবে বহিষ্কার বা সীমান্তে আটকে রাখাকে শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে একটি স্পষ্ট অস্বস্তি ও টানাপোড়েন লক্ষ করা গেছে। ভারতের রাজনৈতিক, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী মহলের একটি অংশে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ঘিরে সন্দেহ, উদ্বেগ এবং কখনো কখনো বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিতেও দেখা গেছে। সীমান্ত পরিস্থিতি, সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে একপাক্ষিক প্রচার, বাংলাদেশবিরোধী মন্তব্য এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করেছে। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদী মহলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখ-তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমমর্যাদা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ভিত্তিতে। কোনো দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব বা চাপ প্রয়োগের কৌশল দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক নয়।
বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে একইসাথে বসবাস করার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। ভারতে যেখানে সামান্য নামাজ আদায় করার কারণে সেখানকার নাগরিকদের পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে চলে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অত্যন্ত আনন্দের সাথে ও স্বস্তিতে নিজ উৎসব পালন করে আসছে। ইসলামের ভেতর অন্তর্নিহিত যে সাম্প্রদায়িক সৌন্দর্য রয়েছে এর জেরেই মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু এই স্বাধীনতার নামে উস্কানিমূলক প্রয়াস চালিয়ে এবং প্রতিবেশি দেশের সন্দেহজনক সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পায়তারা চলছে তা দু:খজনক। আশা করি, বাংলাদেশের সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহল এই বিষয়ে সক্রিয় পদক্ষেপ নেবেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করবেন।