আলতাফ হোসাইন রানা
কবে কখন প্রথম লেখা শুরু করেছিলাম তা এখন আর মনে করতে পারবো না। তবে ছোটবেলা থেকেই বই পড়া, সাহিত্য পড়া এবং লেখালেখির প্রতি খুব আগ্রহ ছিলো। গল্প শোনা ও ভ্রমণপ্রিয়ও ছিলাম খুব। এক সময় এসে সাহিত্যের মায়াজালে জড়িয়ে পড়ি।
অক্ষরজ্ঞান শেখার হাতেখড়িটা শুরু হয় মক্তব থেকে। এরপর স্কুলে। আমার জন্ম সময় ও স্থানটা যদিও পাখি ডাকা সবুজ শ্যামলীমার অপূর্ব সৌন্দর্যে ভরা বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার দক্ষিণ চাদশী গ্রামে। কিন্তু আমি সেই ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছি ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায়।
শৈশব স্মৃতিতে কারো পুকুরে ঢিল মারার খেলা, খেজুর গাছের ঝুলন্ত রসের হাড়ি তাক করে ঢিল ছোড়া, পুকুরে - বিলে সাঁতার কাটা, কাঠবিড়ালির মতো গাছে চড়ে পেয়ারা পাড়া, আম, জাম বড়ই পাড়া খুব বেশি হয়ে ওঠেনি। মাঝে মধ্যে কেবল ধানমন্ডি’র লেকে চলতো দল বেঁধে সাঁতারের পাল্লা। আর বৈশাখের ঝড় বাদলে কারো বাড়িতে ক’জন মিলে আম কুড়ানো, আম কুড়ানো খেলা।
যখন আমি ঢাকার নীলক্ষেত হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন থেকেই শহরের সাহিত্য সভা, আড্ডা গুলোতে ছিলো নিয়মিত যাওয়া আসা।
আমার লেখালেখির একটা ডায়েরি ছিলো। নিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যেস ছোটবেলা থেকেই। প্রতিদিনকার চুম্বকীয় ঘটনা, আনন্দ বেদনার কথা, কখন কোথায় কি করতাম, ভালোলাগার বিষয়গুলো যখনই মনে পড়তো সঙ্গে সঙ্গে লিখে রাখার চেষ্টা করতাম। লুকিয়ে লুকিয়ে ছন্দবদ্ধ পদ্য ছড়া - কবিতা লিখতাম। ছড়া লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ মনে হতো। এক সময় এসে কোমলমতি ছোট ছোট শিশু ও কিশোরদের নিয়ে গল্প লেখা শুরু করি। সেগুলো লেখা হতো কিনা জানি না তবু নিয়মিত লেখার চেষ্টা করা হতো। এভাবে দিন দিন ছড়া কবিতা আর গল্পে ডায়রির পাতা ভরে উঠতো।
ছড়া-কবিতা দিয়েই শুরু। প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় উনিশশো ছিয়াশি সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জাতীয় পত্রিকা সংগ্রাম পত্রিকার শাহীন শিবির (বর্তমানে নীল সবুজের হাট) পাতায়। তখন শাহিন শিবির পাতাটি দেখতেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কবি জয়নুল আবেদীন আজাদ ভাই।
আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় গল্পের। নীলক্ষেত হাইস্কুল শেষ করে আমি ঢাকা সিটি কলেজে ভর্তি হই। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দৈনিক পত্রিকাতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতাম। পড়াশোনা, পত্রিকায় রিপোর্টারের কাজ, লেখালেখি’র চেষ্টা সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করা হতো।
ছুটির দিনগুলোতে ছুটে বেড়াতাম ঢাকার বিভিন্ন স্থানের সাহিত্য সংগঠনগুলোর সাহিত্য সভায়, সাহিত্য আড্ডায়।
বই পড়ার নেশায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়াশোনার জন্য সময় বের করে নিয়মিত যাওয়া আসা করতাম কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি শাহবাগ এবং মহানগর পাঠাগারগুলোতে। কোনো কোনো পাঠাগার থেকে তাদের রেজিস্টার বুকে এন্ট্রি করে পছন্দের বইগুলো বাসায় নিয়ে আসতাম। পড়া শেষে ফেরত দিয়ে আবার নতুন বই আনা হতো।
বই পড়ার জন্য আমার পছন্দের সময় ছিল রাতে। সারাদিন কলেজ, পত্রিকার রিপোর্টের কাজ, সাহিত্য আড্ডা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, সবশেষে ঘরে ফিরে পাঠ্যবই আর রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে রাতকেই বেছে নিতাম সাহিত্য পড়ার জন্য। মাঝেমধ্যে এমন হতো ভালোলাগা কোনো বই পড়তে পড়তে কখন যে বুকের উপর বা বালিশের পাশে বই রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম টের পেতাম না। সকাল হলে বুঝতাম, মা এসে হয়তো তার আদর মাখা হাতে মাথার কাছ থেকে বইটি সরিয়ে রুমের বাতিটি নিভিয়ে দিয়েছেন তার সন্তানের আরামদায়ক ঘুমের জন্য।
পুরনো বই কেনার একটা বাতিক ছিলো। নীলক্ষেত, পল্টন মোড়, বাংলাবাজার ঘুরে ঘুরে কিছু পছন্দের এবং প্রয়োজনীয় বই চোখে পড়লে কিনে ফেলতাম।
যতটুকু মনে পড়ে, তখন নিয়মিত সাহিত্য আড্ডা,সাহিত্য আসরগুলো হতো দৈনিক দেশ পত্রিকার মুকুলের মাহফিলে সেগুনবাগিচায়। বাংলার বাণী’র মতিঝিলে শাপলা শালুকের আসর। এরপর কচিকাচা আসর, খেলাঘর, ফুলকুঁড়ি আসর, বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্র, আবাবিল, কিশোর মেলা, সাহিত্য শতদল এরকম আরো কিছু সাহিত্য সংগঠন যেখানে প্রায়শ দেখা হয়ে যেতো ছড়ার জাদুকর সুকুমার বড়ুয়া, রফিকুল হক দাদুভাই, মাহবুবুল হক, আবু সালেহ, জয়নুল আবেদীন আজাদ, খালেক বিন জয়নুউদ্দীন, ফারুক নওয়াজ, শরীফ আবদুল গোফরান, লুৎফর রহমান রিটন, আসলাম সানী, মনি হায়দার, অমলেশ শাহ, বাকিউল আলম, সারওয়ার-উল-ইসলাম, অনিরুদ্ধ আলম, চন্দন কৃষ্ণ পাল, ওবায়দুল গনি চন্দন, রফিকুল ইসলাম আজাদ, নূরুজ্জামান ফিরোজের মতো অনেকের সাথে।
দেখা হতো, কথা হতো, ভাব বিনিময় হতো কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, মানসুর মুজাম্মিল, মুনিরুল ইসলাম, আতিক হেলাল, মুর্শিদ-উল-আলম, জাকির আবু জাফর, কামরুজ্জামান, শাকিল রিয়াজ, সালেহ মাহমুদ, আমিনুল ইসলাম, জামশেদ ওয়াজেদ এর মতো অনেক চেনা অচেনা প্রিয় মুখের সাথে।
বাংলা সাহিত্য পরিষদ, বিপরীত উচ্চারণ এর সাহিত্য সভাগুলোতে প্রায়শ পেয়ে যেতাম বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ সহ বহু গুণীজনদের। ভাষাবিজ্ঞানী ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, সাংবাদিক কবি সানাউল্লাহ নূরী, আবদুল মান্নান তালিব, তালিম হোসেন, সাজজাদ হোসাইন খান, মোশাররফ হোসেন খান, আসাদ বিন হাফিজ, হাসান আলীম, সোলায়মান আহসান, গাজী এনামুল হক, গোলাম মোহাম্মদ, মুহাম্মদ ইসমাঈল এর মতো কবি, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীদের।
বি’আই’সি’র আয়োজনে ‘কলম পাঠক বৃত্তে’র নিয়মিত সাহিত্য সভা, সাহিত্য সেমিনার হতো নতুন কলম পত্রিকার কার্যালয়। আমি ছিলাম কেন্দ্রীয় ‘কলম পাঠক বৃত্তে’র যুগ্ম আহবায়ক। আমাদের সাহিত্য সভা, সেমিনারে যে উজ্জ্বল তারকা মুখগুলো এসে সভাকে আলোকিত করতেন তাদের মধ্যে অন্যতম কবি ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, আল মাহমুদ, এ কে এম নাজির আহমদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শাহাবুদ্দীন আহমদ, আসাদ চৌধুরী, মতিউর রহমান মল্লিক, মোশাররফ হোসেন খান, নাসির হেলাল, নাসিমুল বারী, মাহমুদ হাফিজ, বদরুল ইসলাম মনির, কামরুল ইসলাম, আহমদ খালিদ হাসান সহ দেশ বরেণ্য লেখকগণ।
এর বাইরেও সুদূর পুরান ঢাকার শিরীষ দাস লেনের বিখ্যাত বিউটি বোর্ডিং থেকে শুরু করে বলতে গেলে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত আর ‘ত্রিবেণী’ সাহিত্য সংসদসহ প্রায় সাহিত্য আসরগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতাম। কখনো লেখক,কখনো তরুণ আলোচক, আবার কখনো আয়োজক হিসেবে ছিলো আমার সরব উপস্থিতি। সাহিত্য ওয়ার্কশপ, সাহিত্য সভাগুলোতে সবার সাথে সাক্ষাৎ হতো, অনুশীলন হতো, জম্পেশ আড্ডা হতো, ভুরিভোজ হতো।
একটা সেতুবন্ধন তৈরি হতো ছোট বড় প্রিয় মুখগুলোর সাথে। পাশাপাশি দৈনিকের শিশু পাতা সহ বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে লেখা পাঠাতাম নিয়মিত। কোনটায় ছাপা হতো, কোনটায় ছাপার জন্য অপেক্ষা করতাম অনেক সময়। সে সময় বিভিন্ন পর্যায়ে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হতো। স্বরচিত ছড়া, কবিতা, গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম। কখনো সখনো প্রথম, দ্বিতীয়, বা তৃতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির আনন্দ সুখানুভূতি উপলব্ধি করতাম প্রাণ ভরে।
পাড়ার কলেজ পড়ুয়া বন্ধুরা মিলে’ বিকাশ’ নামে একটা ছোট কাগজ বের করতাম। কয়েক সংখ্যা বের করার পর কতো যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার থলে ভারী হয়ে উঠতো তা আজ আর লিখলাম না। এখনকার মতো এতটা সহজ ছিলো না বললেই চলে।
আমাদের সময় এখন কার মতো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল ব্যবহার করার মতো এত সুযোগ ছিলো না। যে কারণে লেখা সংগ্রহের জন্য লেখকদের দ্বারে দ্বারে ছুটতে হতো। হাতে টাইপ সাজানো হতো, ছাপা হতো লেটার প্রেস মেশিনে। প্রচ্ছদের ব্লক, ডাইস, তৈরির জন্য ছুড়তে হতো পুরনো ঢাকার টিকাটুলিতে। অনেকটা পুরো ঢাকা শহর চষে বেড়ানোর মতো। সময়ের বিবর্তনে পুরো মুদ্রণ ব্যবস্থা ও কম্পোজিং পদ্ধতিতে এসেছে এখন অনেক পরিবর্তন।
একটি স্মৃতি মনে পড়ে। সে সময় কবি আল মাহমুদ’র কাছে গিয়েছিলাম উনিশশো আটাশি সালে। তখন তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’তে কর্মরত। আমি আর আমার লেখক বন্ধু শাহ মোহাম্মদ আলম। যতটুকু মনে পড়ে একটি কবিতার জন্য আমরা আটবার কবি আল মাহমুদ’র কাছে গিয়েছিলাম। তবু হাল ছাড়িনি। শত ব্যস্ততার মাঝেও শেষ অব্দি দিওয়ানে : হাফিজ স্মরণে শিরোনামে নতুন একটি কবিতা আল মাহমুদ’র কাছ থেকে লিখিয়ে আনতে সফল হয়েছিলাম।
সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘বিকাশ’র পাশাপাশি শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ক লিটলম্যাগ’ দ্রষ্টব্য ‘ নামে আরেকটি ছোট কাগজ বের করতাম সে সময়। ‘দ্রষ্টব্য’র সম্পাদক ছিলেন কবি, শিক্ষাবিদ কামরুল হুদা পথিক আর আমি ছিলাম সহযোগী সম্পাদক। দুটো পত্রিকা’ই ছত্রিশ সেন্ট্রাল রোড, ঢাকা থেকে নিয়মিত বের হতো।
যেহেতু আমরা তখন ছাত্র। পড়াশোনার মধ্যে সবাই ব্যস্ত। সময় বের করে অবসরে আমরা তখন চেষ্টা করতাম খুঁজে খুঁজে লেখক বন্ধুদের সঙ্গে এবং সাহিত্য পছন্দ করেন, ভালোবাসেন, বই পড়েন, বই প্রকাশ করেন, পৃষ্ঠপোষকতা করেন, এমন স্বজনদের সঙ্গে একে অন্যের সেতুবন্ধন তৈরি করা, সাহিত্য সভার আয়োজন করা, সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠান করা।
এভাবেই একদিন পরিচয় মেলে মোঃ সফিউদ্দিন’র সাথে। পরে অবশ্য জানতে পারলাম মোঃ সফিউদ্দিন একজন শিশু সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক এবং কবি। তার হাতিরপুল তিপ্পান্ন সার্কুলার রোডস্থ এম এস প্রকাশনীর ছাপাখানা কাম অফিসে নিয়মিত জমজমাট সাহিত্য আড্ডা হতো। যাওয়া-আসা ছিলো সুরকার গীতিকার শিল্পী ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান এবং কবি মুফাখখারুল ইসলাম ও কবি যাযাবর ওসমানের মতো লেখক, শিল্পীদের। নানা কারণেই সে সময় এম এস প্রকাশনীটি ছিলো লেখকদের একটা আড্ডাস্থান। আরো যাদেরকে দেখা যেতো আনিসুল হক চৌধুরী, খালেক বিন জয়নুদ্দীন, কামরুল হুদা পথিক, জিয়াউল আহসান, চন্দন কৃষ্ণ পাল, কাজী জিয়া শামস, শাহীন আল মামুন সহ খ্যাতীয়মান লেখক কবি সাহিত্যিকদের। অনেকের নাম এই মুহূর্তে মনে করতে না পারার কারণে উল্লেখ করা সম্ভব হলো না।
বলছিলাম প্রথম বই প্রকাশের কথা। লেখক মোঃ সফিউদ্দিন’র আন্তরিকতা ও উৎসাহেই তাকে আমার প্রথম শিশুতোষ গল্পের পান্ডুলিপি দেই। আটটি শিশুতোষ গল্প নিয়ে উনিশশো তিরানব্বই সালে এম এস প্রকাশনী থেকে আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ময়ূরের নাচ’ বের হয়। অফহোয়াইট কাগজে তিন ফর্মার বোর্ড বাধাই বইটির মূল্য রাখা হয়েছিলো পয়ত্রিশ টাকা। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছিলো রম্য লেখক শাহ মোহাম্মদ আলম, মোঃ সফিউদ্দিন, আশরাফুল হক বাবু, রমজান, ছিটু, নাদিম, ফারুক হোসেন টনি, হারুন আল রশিদ রাজু এবং সেলিনা জাহান করবী অভিন্ন হৃদয়েষুকে। বইটির প্রথম প্রচ্ছদ করেছিলেন শিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদ। পরে অবশ্য প্রথম প্রচ্ছটি নিখোঁজ হওয়ার কারণে দ্বিতীয়বার প্রচ্ছদ করে দেন বন্ধুবর শিল্পী কাজী জিয়া শামস। প্রথম বইটির মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন ছড়াকার লুৎফুর রহমান রিটন। বইটি বের করবার সময় সার্বিকভাবে সহযোগিতা এবং উৎসাহ দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছিলো একসময়ের জনপ্রিয় রম্যলেখক শাহ মোহাম্মদ আলমসহ অনেকেই।
আমার লেখার মধ্যে দেশ, মাটি ও মানুষের কথাই যেনো লেখার চেষ্টা করেছি। আমি এখনো যতটুকু পারছি লিখছি, লেখার চেষ্টা করছি। সময় পেলেই পড়ছি এবং শিখছি, শেখার চেষ্টা করছি।