নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার (ডিইও) কার্যালয়ে আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও স্টেশনারিসামগ্রী ক্রয়ের নামে প্রায় ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবে কোনো পণ্য ক্রয় বা সরবরাহ না হলেও কাগজে-কলমে প্রাক্কলন তৈরি, ক্রয় দেখানো এবং বিল-ভাউচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাহাড়তলী, চট্টগ্রামের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনটি পৃথক প্যাকেজের মাধ্যমে মোট ২০ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৩ টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোতে গিয়ে এসব পণ্যের বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
নথি অনুযায়ী, প্রথম প্যাকেজে ডিইও চট্টগ্রামের আওতাধীন বিভিন্ন কাচারি ও দপ্তরের জন্য ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৭৬ টাকার আসবাবপত্র ক্রয়ের প্রাক্কলন করা হয়। এতে আটটি সেক্রেটারিয়েট টেবিল, আটটি মেডিপ্যাথিক চেয়ার, ১৬টি ভিজিটিং চেয়ার এবং পাঁচটি অফিস আলমিরা কেনার কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রাক্কলনে হাতিল, অটবি, রিগ্যাল বা সমমানের ব্র্যান্ডের পণ্যের কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এসব সামগ্রী সংশ্লিষ্ট অফিসে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, কয়েকটি পণ্যের মূল্য বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে। যেমন একটি সেক্রেটারিয়েট টেবিলের মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা, একটি মেডিপ্যাথিক চেয়ারের দাম ২৮ হাজার ৬৭১ টাকা এবং একটি অফিস আলমিরার মূল্য ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ধরনের পণ্য অনেক কম দামে সরকারি ক্রয়ে পাওয়া সম্ভব।
একই সময়ে দ্বিতীয় প্যাকেজে ফেনী ও লাকসাম কাচারি অফিসের জন্য ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৪ টাকার দুটি কম্পিউটার সেট, দুটি লেজার প্রিন্টার এবং দুটি ইউপিএস কেনার প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়। নথিতে প্রতিটি কম্পিউটার সেটের মূল্য ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৫২ টাকা ধরা হয়েছে, যা সাধারণ সরকারি অফিসে ব্যবহৃত কনফিগারেশনের কম্পিউটারের তুলনায় অনেক বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এছাড়া তৃতীয় প্যাকেজে ডিইও কার্যালয়ের জন্য ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮৪৩ টাকার স্টেশনারি সামগ্রী কেনার প্রাক্কলন করা হয়। এতে এ-ফোর ও লিগ্যাল সাইজের কাগজ, ক্যালকুলেটর, স্ট্যাপলার, স্ট্যাপলার পিন, পাঞ্চ মেশিন, গাম, বাইন্ডিং টেপ, পেপার ওয়েট, পেন স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন অফিস সামগ্রীর তালিকা রয়েছে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, নথিতে বিপুল পরিমাণ কাগজ ও অন্যান্য স্টেশনারি সামগ্রী কেনা দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সেই পরিমাণ মালামালের কোনো হিসাব বা ব্যবহারিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, এত বড় পরিমাণে আসবাবপত্র, কম্পিউটার কিংবা স্টেশনারি তাদের দপ্তরে কখনো সরবরাহ করা হয়নি।
নথি পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, তিনটি প্রাক্কলনেই একই ধরনের ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে “বাজার দর যাচাই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে” ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ওই বাজারদর যাচাই কমিটির কার্যক্রম, সভার কার্যবিবরণী কিংবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি কাগজে-কলমে সম্পন্ন করে সরকারি অর্থ উত্তোলনের পথ তৈরি করা হয়েছে।
সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমার বেশি মূল্যের পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, সরবরাহের প্রমাণ, গ্রহণ কমিটির প্রত্যয়ন এবং স্টক রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দুর্নীতি দমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের স্টক রেজিস্টার, বিল-ভাউচার, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র, গ্রহণ কমিটির প্রতিবেদন এবং অর্থ ছাড়ের নথি একসঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। পাশাপাশি ফেনী ও লাকসাম কাচারি অফিসে গিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জামের বাস্তব উপস্থিতিও যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি শুধু সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা নয়, বরং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাই বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাহাড়তলী, চট্টগ্রামের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ম্পিউটার দুটি নয়, পাঁচটি কেনা হয়েছে। আসবাবপত্র ও স্টেশনারি সামগ্রীও নিয়ম অনুযায়ী ক্রয় করা হয়েছে।’