আল জাজিরা : গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধন নিজের চোখে দেখেছেন মোহাম্মদ জাকি আল-বাকরি। একসময় তিনি গাজার দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর খান ইউনিসে বসবাস করতেন। তিনি প্রায় ২০ মাস ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ছিলেন। এ সময়ে তাঁকে ইসরায়েলের পাঁচটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে আল-বাকরি বলেন, ‘তারা আমাদের কাপড় খুলে নগ্ন করে ফেলেছিল। আমাদের হাতকড়া পরানো ছিল...আমাদের হাত পেছনে বাঁধা ছিল, পা বাঁধা ছিল এবং আমাদের চোখও বেঁধে রাখা হয়েছিল।’ এরপর আল-বাকরি বর্বর ইসরায়েলি সেনারা তাঁর সঙ্গে করা ভয়াবহ সহিংসতার সেই অভিযোগগুলো করেন, যেগুলো ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। আল-জাজিরা সেসব বর্ণনার হুবহু প্রকাশ করতে পারেনি। আল-বাকরি বলেন, ‘কাপড় খুলে নেওয়ার পর আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল একটি বড় কুকুর দিয়ে।’ সাক্ষাৎকারের অন্য এক অংশে বাকরি আরও বলেন, ‘আমরা সাতজন ওই কুকুরের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম।’
আল–জাজিরার ডকুমেন্টারি (তথ্যচিত্র) দল মাসের পর মাস অনুসন্ধান চালিয়ে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ছিলেন—এমন ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে এমন সব বর্ণনা সংগ্রহ করেছে, যেখানে কুকুরকে শুধু ভয় দেখানোর উপায় হিসেবে নয়; বরং যৌন হেনস্তার মাধ্যমে অপমান করার প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ কেবল তিনি একাই করেননি। আরও অনেকের কাছ থেকে এমন অভিযোগ এসেছে।
আল-জাজিরার ডকুমেন্টারি (তথ্যচিত্র) দল মাসের পর মাস অনুসন্ধান চালিয়ে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ছিলেন—এমন ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে এমন সব বর্ণনা সংগ্রহ করেছে, যেখানে কুকুরকে শুধু ভয় দেখানোর উপায় হিসেবে নয়; বরং যৌন হেনস্তার মাধ্যমে অপমান করার প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে বন্দীদের বিবস্ত্র করা হতো, চোখ বেঁধে দেওয়া হতো, হাতকড়া পরানো হতো, উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হতো, মারধর করা হতো, হুমকি দেওয়া হতো, ভিডিও ধারণ করা হতো এবং তাদের ওপর হামলা চালানো হতো। আল-জাজিরার নির্মিত অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট উইপেন’-এ ইসরায়েলে বন্দী গাজার ফিলিস্তিনি এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাস করা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের নিপীড়নের চিত্র উঠে এসেছে।
‘আমরা অক্ষম, আমাদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। তারা হাসছে। আর অবশ্যই তারা আমাদের ভিডিও করেছে।’ ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী গাজার আরেক ফিলিস্তিনি তাঁর নাম প্রকাশ করেননি। তথ্যচিত্র তাঁকে ছদ্মনামে ডাকা হয়। তিনি বলেন, তাঁকে ইসরায়েলের আটটি আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছিলেন। ওই গাজার বাসিন্দা বর্ণনা করেন, ইসরায়েলের কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে আটক থাকাকালে একইভাবে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে বন্দীদের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হতো। গাজার আরেক ফিলিস্তিনিও বন্দী অবস্থায় কুকুরের হামলার শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন। যৌন নিপীড়নে কুকুর ব্যবহারের বিষয়টি ছাড়াও আরেক সাবেক বন্দী ও অধিকারকর্মী শিরিন (ছদ্মনাম) বারবার বিবস্ত্র করা এবং অপমানজনকভাবে দেহতল্লাশি করার কথা বলেছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনের বাসিন্দা আদনান হাসানও কিশোর বয়সে বন্দী ছিলেন। তিনি বলেন, তাঁকে গ্রেপ্তারের পর পাঁচ মাস আটকে রাখা হয়েছিল।
যৌন অপমান ও হুমকি ব্যবহার করা হয় মানুষকে চুপ করিয়ে রাখার জন্য। সামাজিক কলঙ্কের কারণে পুরুষ ও ছেলেরা অনেক সময় এ নিয়ে কথা বলেন না। নারীরা সামাজিক শাস্তির ভয়ে থাকে, আর শিশুরা এমন লজ্জা বহন করে, যা প্রকাশ করার মতো ভাষাই তাদের নেই।’ জেরুজালেমের বাসিন্দা মায়স আবু ঘোশ কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে বন্দী ছিলেন। তিনি কারাগারটিকে এমন একটি স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে অপমান নিত্যদিনের ঘটনা।
তাঁদের এসব সাক্ষ্যে এ ধরনের ঘটনা একটি কারাগারে, একজন কারারক্ষী দ্বারা বা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ওঠে আসেনি; বরং তাঁরা এটিকে বন্দী নিপীড়নের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নগ্ন করা, মারধর, ভিডিও ধারণ: ফিলিস্তিনের সরকারি সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে। জাতিসংঘের দেওয়া একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬৭ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ৮ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন।
ফিলিস্তিনিদের জন্য কারাবন্দী থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ক্রমাগতভাবে চলা এক অভিজ্ঞতা। একজন ফিলিস্তিনি নিজের বাড়িতে, কোনো তল্লাশিচৌকিতে, হাসপাতালের ভেতরে, আশ্রয়কেন্দ্রে বা কোনো সামরিক অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।
এরপর সেই ফিলিস্তিনিকে সেনা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সামরিক আটক কেন্দ্র, পুলিশি হেফাজত, সামরিক আদালত এবং ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস পরিচালিত কারাগারগুলোর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু স্থাপনাগুলোর নাম বদলায়—সদে তেইমান, ওফের, নেগেভ, আশকেলন, জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র, চেকপয়েন্ট ও সামরিক শিবির। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার বিবরণগুলো বারবার একই থাকে, ফিরে ফিরে আসে। একটি নাম হয়ে যায় একটি সংখ্যা—কাপড় খুলে নেওয়া হয়। চোখ বাঁধা হয়। হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না, ঘুমাতে দেওয়া হয় না। কুকুর আনা হয়। বন্দীদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়। অনেককে ধর্ষণ করা হয়। ফিলিস্তিনের সরকারি সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে। জাতিসংঘের দেওয়া একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬৭ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ৮ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন, নির্যাতনের সময় তাঁদের ভিডিও করা হয়েছে। অনেকেই বলেন, তাঁদের এসব অভিযোগ কোথাও পৌঁছায় না। আল-বাকরির বেলায়ও কুকুর শুধু ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল, বিষয়টা এমন নয়। তিনি বলেন, ‘এটি হামলারই অংশ ছিল। তারা আমাদের দিকে কুকুর নিয়ে আসে, তারপর লাথি মারতে শুরু করে। তারা আমাদের পেছন থেকে কুকুর দিয়ে আক্রমণ করতৃতারা পাগলের মতো কুকুর দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালাত।’