ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া লাইসেন্স বাতিলের নোটিসকে বেআইনি বলে দাবি করেছে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই নোটিসের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আজীবন ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে থাকাসহ সম্মানজনক ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে হাসপাতালটি।

গতকাল শনিবার দুপুরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র অ্যাডভোকেট শিশির মনির এসব কথা জানান। আইনজীবী শিশির মনির বলেন, লাইসেন্স বাতিল করার জন্য সরকার যে নোটিস পাঠিয়েছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন নোটিসের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেবো।

সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গত বৃহস্পতিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া কারণ দর্শানোর যে নোটিস দেওয়া হয়েছে সেটার জবাব আগামীকাল বিকেল ৫টার মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রদান করা হবে। কিন্তু জবাবের বিষয় সন্তোষজনক না হলে কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় নোটিসে; যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সারমর্মের বিষয়ে শিশির মনির বলেন, শিশুদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ওয়ার্ডে অক্সিজেন স্বল্পতা ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে অক্সিজেনের মাত্রা কতটুকু ছিল, কার্বনডাইঅক্সাইড কী পরিমাণে ছিল সেটার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। আরেকটি প্রশ্ন কতটুকু অক্সিজেন থাকলে শিশুর মৃত্যু ঘটবে না সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এখানে অস্পষ্টতা থেকে যায়।

তিনি বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। পেশাগত অবহেলার কারণে প্রাথমিকভাবে দুজন নার্সকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে চূড়ান্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এই আইনজীবী আরও বলেন, ভিকটিম পরিবার ও আদ-দ্বীন হাসপাতাল যৌথভাবে মনে করে, এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি যেন ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ না হয়। তবে যারা এর পেছনে প্রকৃত দায়ী, পরিবার তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও এতে একমত।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে হাসপাতালের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিশেষ ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে আজীবন থাকার অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে পরিবারের কোনো সদস্য উপযুক্ত বা যোগ্য হলে তাকে হাসপাতালে চাকরি দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে একটি সম্মানজনক আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে বলেও জানানো হয়। সেবার মান বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

এদিকে রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে হাসপাতালটি বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়েছেন নিহত এক শিশুর বাবা হাবিবুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমরা চাই প্রকৃত দোষীর শাস্তি হোক।

এসময় শিশির মনির বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিসের ভিত্তিতে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব রোববার আজ বিকেল ৫টার মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে। তবে নোটিসে জবাব সন্তোষজনক না হলে কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, যা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেন তিনি।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে শিশির মনির বলেন, নবজাতকদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ওয়ার্ডে অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের সুনির্দিষ্ট মাত্রা উল্লেখ করা হয়নি। একইসঙ্গে কতটুকু অক্সিজেনের ঘাটতি হলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সে বিষয়েও পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা, চাকরির সুযোগ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে অনাকাক্সিক্ষত আচরণের জেরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করেছে। সেইসাথে দুই কর্মীকে অব্যাহতি দিয়েছে। আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের এইচ আর অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এ কথা জানান, ২৭ মে ছয়জন নবজাতক শিশুর দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় ৩০ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। মন্ত্রীর হাসপাতাল ত্যাগের পর বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক হাসপাতালে প্রবেশের চেষ্টা করেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বার্থে কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের হাসপাতালে প্রবেশ নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন।

হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথার একপর্যায়ে জনৈক সাংবাদিক হাসপাতালের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের ঝাড়ু-দার সম্বোধন করলে কর্মীরা অপমাণিত বোধ করে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং সাংবাদিকদের হাসপাতাল ত্যাগের অনুরোধ করেন। এ সময় উপস্থিত হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের কর্মীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন।

উক্ত অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ ওই দিনই দুঃখ প্রকাশ করে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে এবং তদন্ত করে দুজন কর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দিয়েছে। অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মীদের সামাজিক মর্যাদার স্বার্থে তাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।