ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেছেন, অন্য সব ব্যাংকের মতোই ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র দাবি করেছেন কিছু ব্যাংকের উদ্যোক্তা শেয়ার হোল্ডারদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তবে এটি ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সঠিক নয়। উদ্যোক্তাদের সাথে যথাযথভাবে যোগাযোগ না করে এই ধরনের কথা বলা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য মোটেই সমীচীন নয়। একই সাথে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ২০১৭ সালের আগে থাকা প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া, ব্যাংক থেকে লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে সাত দফা দাবি উত্থাপন করেন।
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের উদ্যোগে গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের নেতৃবৃন্দসহ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীরা উপস্থিত ছিলেন।
৭ দফা দাবিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের চলমান কর্মসূচি অব্যহত আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে শনিবারের পূর্বঘোষিত গ্রাহকদের মহাসমাবেশ স্থগিত করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৭ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে, খুব শীঘ্রই মহাসমাবেশ সহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হবে। এসময় গ্রাহকদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনভাবেই পিছপা হবেন না বলে ঘোষণা দেন।
৭ দফা দাবি সমূহ
পেশাদার পর্ষদ গঠন: অবিলম্বে অংশীজনদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সৎ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।
প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর: ২০১৭ সালে গায়ের জোরে ও রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার করে এই ব্যাংকের যে বৈধ মালিকানা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা অবিলম্বে ব্যাংকের প্রকৃত ও আদি মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। সাধারণ গ্রাহক ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এই ব্যাংককে পুনরায় কোনো লুটেরা বা রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তের শিকার হতে দেওয়া যাবে না।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিদায়ী ফ্যাসিস্ট সরকার এবং তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় এস আলমসহ যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
স্থিতিশীলতা ও অপপ্রচার রোধ: ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বিরাজমান আতঙ্ক দূর করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে যেকোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে বিরত থাকতে হবে। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে চলমান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার রোধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্যাংকের লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার ও এস আলমের সম্পদ বাজেয়াপ্ত: একটি বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিশেষ সেল গঠন করে লুটেরাদের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে হবে। অর্থঋণ আদালতে লুটেরাদের বিচারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত থেকে তারা যাতে কোনো প্রকার ‘স্থিতাবস্থা’ বা আইনি সুবিধা না পায়, সেজন্য প্রয়োজনে দ্রুত আইন সংশোধন করতে হবে। (উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে এই আদালত থেকে এস আলমের ঋণের কোনো অনিয়ম তদন্ত করা যাবে না মর্মে রুলনিশি জারি করা হয়েছিল, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক)।
লুটেরাদের পুনর্বাসন রোধ (আইন সংশোধন): ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী লুটেরাদের পুনরায় ব্যাংকে পুনর্বাসনের যে ছদ্মবেশী সুযোগ রাখা হয়েছিল তা বন্ধ করার জন্য ১৮/ক ধারা বাতিল হবে মর্মে সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু বিল আকারে উপস্থাপনের মাধ্যমে তা এখনো রহিতকরণ করা হয়নি। তাছাড়া এ ধরনের অপকর্মকারীদের আজীবন ব্যাংক তথা অর্থনৈতিক সেক্টরে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।
সংসদীয় বক্তব্য প্রত্যাহার: জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীরা যে, অসত্য ও বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন তা অনতিবিলম্বে তা প্রত্যাহার করতে হবে। আমরা দৃঢ়তার সহিত বলতে চাই, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশেষ পরিবারের সম্পদ নয়। এটি দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, বিশ্বাস, আবেগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সাথে জড়িত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। আমরা সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি, ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য বোর্ড গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা রক্ষায় অনতিবিলম্বে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।